অভ্যাসের ভালোবাসা

ভালোবাসা সবসময় ঝলমলে হয় না।
কখনো কখনো ভালোবাসা হয়—অভ্যাসের মতো।
চোখে পড়ে না, শব্দ করে না, তবু প্রতিদিন ঠিক সময়টায় উপস্থিত থাকে।

তৃষা সকালবেলার জানালাটা খুলল। রোদের একটা সরু রেখা মেঝেতে এসে পড়ল। বাইরে পাখির ডাক, নিচে রাস্তার শব্দ—সব মিলিয়ে একটা পরিচিত সকাল। এই পরিচিতিটাই তার ভালো লাগে। কারণ পরিচিত জিনিসে ভয় কম।

ঘড়িতে সকাল ছ’টা চল্লিশ।

আজও অনীক অফিসে যাবে তাড়াতাড়ি।
আজও তৃষা আগে উঠেছে।

তাদের বিয়ে হয়েছে পনেরো বছর।
পনেরো বছর মানে—একসাথে অনেক সকাল, অনেক রাত।

শুরুর দিকে তৃষা ঘুম ভাঙত দেরিতে। অনীক তাকে ডেকে তুলত। এখন উল্টো। তৃষাই কেটলি বসায়, চা বানায়, জানালাটা খোলে। এই বদলটা কোনো ঝগড়ার ফল না—সময় নিজেই এনে দিয়েছে।

তৃষা কিচেনে ঢুকে পড়ল। চুলায় কেটলি বসাল। এই কাজটা তার হাত জানে। ভাবতে হয় না।

বেডরুম থেকে অনীকের কাশির শব্দ এল।
তৃষা বলল—
— “গরম জল রেখেছি।”

— “হুম,”
অনীক উত্তর দিল।

এই হুম শব্দটা তৃষা বোঝে। মানে—সে শুনেছে, কৃতজ্ঞ।

তারা দু’জনেই জানে—সকালের কথা কম হয়।
কারণ সকাল মানে প্রস্তুতি।
রাত মানে বোঝাপড়া।

অনীক বাথরুম থেকে বেরোল। শার্ট পরছে। তৃষা চায়ের কাপ এগিয়ে দিল।

— “চিনি কম?”
সে জিজ্ঞেস করল।

— “হ্যাঁ,”
অনীক বলল।

এই প্রশ্নটা সে প্রতিদিনই করে।
এই উত্তরটাও প্রতিদিন একই।

কিন্তু একদিন যদি না করে—তৃষা বুঝবে, কিছু একটা ঠিক নেই।

তারা টেবিলে বসল। ব্রেড, ডিম, ফল। কোনো আয়োজন নেই—কিন্তু অভাবও নেই।

— “আজ ফিরতে দেরি হবে,”
অনীক বলল।

— “জানি,”
তৃষা বলল।

এই জানি শব্দটা অভিযোগ না।
এটা হিসেব।

অভ্যাসের ভালোবাসা মানে—হিসেব রাখা।
কে কখন ফিরবে, কে কখন খাবে, কার মাথা কখন ভারী।

এই হিসেবটা ভালোবাসা ছাড়া রাখা যায় না।

অনীক বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হলো। তৃষা জানালার পাশে দাঁড়াল। নিচে সে হাঁটছে—চেনা ভঙ্গি। এই ভঙ্গিটা সে পনেরো বছর ধরে দেখছে।

তার মনে পড়ল—একসময় সে এই ভঙ্গি নিয়ে কবিতা লিখতে চাইত। এখন আর চায় না। কারণ কবিতা না লিখলেও অনুভূতিটা আছে।

দিনটা তৃষার নিজের মতো কেটে গেল। বাজার, কাজ, ফোনকল। এই কাজগুলো সে করে—ভালোবেসে না, দায়িত্ববোধে। কিন্তু দায়িত্ববোধও ভালোবাসারই একটা রূপ।

সন্ধ্যায় সে রান্না শুরু করল। আজ অনীক দেরি করবে—তাই তরকারি ঢেকে রাখল। চুলার আগুন কম।

এই আগুন কম রাখাটাই অভ্যাসের ভালোবাসা।

রাত ন’টার দিকে দরজার শব্দ।

— “এলে?”
তৃষা বলল।

— “হ্যাঁ,”
অনীক বলল।

তার গলায় ক্লান্তি। তৃষা রান্নাঘর থেকে বেরোল না সঙ্গে সঙ্গে। আগে তাকে নিজের মতো হতে দিক।

খাওয়ার সময় অনীক ধীরে খাচ্ছিল। তৃষা খেয়াল করল—আজ সে কম কথা বলছে।

— “দিনটা ভারী?”
সে জিজ্ঞেস করল।

— “হ্যাঁ,”
অনীক বলল।
— “কিন্তু শেষ।”

এই শেষ শব্দটাই তৃষার দরকার ছিল।

১০

খাওয়ার পর অনীক প্লেট তুলল।
— “আমি ধুয়ে দিচ্ছি।”

তৃষা থামাল না। সে জানে—এই কাজটা অনীকের নিজের ভার নামানোর একটা উপায়।

১১

সোফায় বসে তারা চুপ করে রইল। টিভি বন্ধ। ফোন দূরে। জানালার বাইরে শহরের আলো।

— “আমরা কি খুব একঘেয়ে?”
অনীক হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

তৃষা তাকাল।
— “হতে পারি,”
সে বলল।
— “কিন্তু নিরাপদ।”

অনীক হেসে ফেলল।
— “নিরাপদ ভালো।”

১২

নিরাপদ মানে—প্রতিদিন একইভাবে ফিরে আসা।
নিরাপদ মানে—ঝড় এলেও ছাদ থাকা।

১৩

রাতে তারা ঘরে গেল। আলো কম। ল্যাম্প জ্বলছে। তৃষা বিছানায় চাদর ঠিক করল। অনীক ফোনটা নামিয়ে রাখল।

— “আজ ফোনটা বাদ,”
সে বলল।

— “ভালো,”
তৃষা বলল।

এই ভালো শব্দটা দু’জনকেই হালকা করল।

১৪

তারা পাশাপাশি শুয়ে। মাঝখানে সামান্য ফাঁক। এই ফাঁকটা তারা ভয় পায় না। কারণ তারা জানে—এই ফাঁকই কখনো কখনো শ্বাস নেওয়ার জায়গা।

— “তুমি কি আমাকে এখনো ভালোবাসো?”
অনীক হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

এই প্রশ্নটা নতুন না।
কিন্তু প্রতিবারই গুরুত্বপূর্ণ।

তৃষা ভেবে বলল—
— “আমি প্রতিদিন তোমাকে বেছে নিই।”

অনীক তাকাল।
— “এটাই ভালোবাসা?”

— “হ্যাঁ,”
তৃষা বলল।
— “অভ্যাসের মতো।”

১৫

অভ্যাস মানে বিরক্তি না।
অভ্যাস মানে—না ভেঙে যাওয়া।

তৃষা অনীকের হাতের দিকে তাকাল। হাতটা বিছানার কিনারায়। খুব কাছে। সে হাত বাড়াল। আঙুল ছুঁল। এই স্পর্শে কোনো উত্তেজনা নেই—শুধু আশ্বাস।

— “এইটা আমার পছন্দ,”
অনীক বলল।

— “জানি,”
তৃষা বলল।

১৬

তারা খুব কাছে এল না।
এই না-এল ইচ্ছের।

অভ্যাসের ভালোবাসা তাড়াহুড়ো চায় না।

১৭

কিছুক্ষণ তারা চুপ করে রইল। শ্বাসের শব্দ। বাইরে দূরের গাড়ি।

— “আমরা কি বদলে গেছি?”
অনীক বলল।

— “হ্যাঁ,”
তৃষা বলল।
— “আর সেটা ভালো।”

১৮

ভালো মানে—আজ তারা ঝগড়া করে না এমন নয়।
ভালো মানে—ঝগড়ার পরও তারা ফিরে আসে।

১৯

ঘুম আসার আগে তৃষা বলল—
— “কাল আমি দেরিতে উঠব।”

অনীক হেসে ফেলল।
— “আমি চা বানাব।”

এই ছোট প্রতিশ্রুতিগুলোই সংসার।

২০

আলো নিভে গেল।
ঘর অন্ধকার।

অভ্যাসের ভালোবাসা আলো চায় না।
সে অন্ধকারেও পথ খুঁজে নেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *