একই ঘরে, আলাদা নীরবতা

একই ঘরে থাকলেই যে কাছাকাছি থাকা হয়—এ কথা ঠিক না।
কাছাকাছি থাকা অনেক সময় শব্দে নয়, দূরত্বের হিসাবেও নয়—থাকে নীরবতার ভেতরে।

মায়া টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালাল। আলোটা ইচ্ছে করে কম। ঘরের কোণগুলো আধো ছায়ায় মিলিয়ে গেছে। জানালার বাইরে শহরের শব্দ—একটানা, ধীর। ঘড়িতে রাত সাড়ে এগারো।

আজ তারা একই ঘরে।

এই “একই ঘর”—শব্দদুটো শুনতে সাধারণ, কিন্তু ভেতরে একটা দায়িত্ব আছে। কারণ একই ঘরে থাকাটা তাদের কাছে নতুন না, তবু প্রতিবারই আলাদা।

অয়ন জুতোর ফিতা খুলে রাখল। ব্যাগটা চেয়ারের পাশে রেখে দিল। সে খুব চুপচাপ। এই চুপচাপটা অস্বস্তিকর নয়—অভ্যাসের মতো। মায়া খেয়াল করল, সে জানালার দিকে তাকাল না। আজ সে জানালার মানুষ নয়; আজ সে ঘরের মানুষ।

— “চা?”
মায়া জিজ্ঞেস করল।

— “হালকা,”
অয়ন বলল।
এই হালকা শব্দটা তারা দু’জনেই বুঝে নেয়—চিনির মতো, কথার মতো, উপস্থিতির মতো।

মায়া রান্নাঘরে গেল। কেটলির শব্দ উঠল। এই শব্দটা তাদের কথোপকথনের অংশ—ফাঁকা জায়গা ভরাট করার জন্য নয়, বরং সময়ের গতি ঠিক রাখার জন্য।

তাদের পরিচয়টা বহুদিনের। বন্ধুত্বের মতো শুরু, তারপর কোনো এক অদৃশ্য জায়গায় এসে থেমে থাকা। থেমে থাকা মানে শেষ হওয়া নয়; মানে এমন এক জায়গায় দাঁড়ানো, যেখানে নাম দেওয়া দরকার পড়ে না।

দিনে তারা আলাদা মানুষ।
রাতে—একই ঘরে—তারা নিজেদের মতো।

চা নিয়ে ফিরে এসে মায়া ট্রে টেবিলে রাখল। দুটো কাপ, মাঝখানে জায়গা। এই জায়গাটুকুই তাদের সীমা। তারা কেউই কাপটা মাঝখান থেকে সরায় না।

— “আজ দিনটা কেমন?”
মায়া জিজ্ঞেস করল।

— “মাপা,”
অয়ন বলল।
— “তোমার?”

— “শান্ত,”
মায়া উত্তর দিল।
এই দুটো শব্দ একসাথে ভালো শোনায়—মাপা আর শান্ত।

তারা সোফায় বসে। পাশে পাশে না—সামান্য ফাঁক রেখে। এই ফাঁকটা কখনো কমে, কখনো বাড়ে। আজ ফাঁকটা ঠিক জায়গায়।

চায়ের ভাপ উঠছে। অয়ন কাপটা দুই হাতে ধরেছে। মায়া লক্ষ করল—সে কাঁধ ঢিলা করে বসেছে। ক্লান্তির চিহ্ন। কিন্তু এই ক্লান্তি কথা চায় না।

— “আজ কথা কম থাক,”
মায়া বলল।

অয়ন মাথা নেড়াল।
— “ভালো।”

এই ভালো শব্দটা তাদের মধ্যে বারবার আসে। কারণ এটা অনুমতির মতো—চুপ থাকার অনুমতি।

একই ঘরে থেকেও তারা আলাদা নীরবতায় থাকে। মায়া ফোনটা খুলল না। অয়নও না। স্ক্রিনের আলো আজ দরকার নেই। আজ তারা চোখের আলোয় থাকবে—কম আলোয়, কম দেখায়, বেশি অনুভবে।

বাইরে একটা গাড়ি হর্ন দিল। ভেতরে তারা স্থির।

— “তুমি কি জানো,”
অয়ন ধীরে বলল,
— “একই ঘরে থাকলে নীরবতাটা আলাদা লাগে?”

মায়া তাকাল।
— “কারণ এখানে কেউ পালাতে পারে না,”
সে বলল।
— “তাই সবাই সতর্ক হয়।”

অয়ন হালকা হাসল।
— “সতর্কতা কখনো কখনো যত্ন।”

মায়া উঠে পর্দাটা একটু সরাল। বাইরের আলো ঢুকল—নরম। ঘরের ছায়াগুলো জায়গা বদলাল। অয়ন দেখল—মায়ার হাতটা পর্দার কাপড়ে থেমে আছে। আঙুলগুলো স্থির। সে এগোল না। এই না-এগোনোটাই আজকের নীরব স্পর্শ।

— “আজ এখানে থাকি,”
মায়া বলল।
— “ভেতরে।”

— “ভেতরটা বড়,”
অয়ন বলল।
— “চলবে।”

তারা আবার বসল। এইবার সোফার দুই প্রান্তে। একই ঘর, আলাদা নীরবতা—কিন্তু ছন্দ এক। সময় ধীরে চলছে। কেউ তাড়া দিচ্ছে না।

— “তুমি কি কখনো ভয় পাও?”
মায়া হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

— “কিসের?”
অয়ন জানতে চাইল।

— “এই একই ঘরের,”
মায়া বলল।
— “এতটা কাছাকাছি থাকার।”

অয়ন একটু ভেবে বলল,
— “ভয় পাই না। আমি সীমা চিনি।”

এই সীমা শব্দটা মায়ার কাছে আশ্বাসের মতো। সীমা থাকলে নষ্ট হয় না।

মায়া উঠে বইয়ের তাক থেকে একটা বই নামাল। খুলল না। শুধু হাতে নিল। অয়ন বুঝল—এটা পড়ার জন্য না। এটা ধরে থাকার জন্য।

— “আজ পড়ব না,”
মায়া বলল।

— “জানি,”
অয়ন বলল।
— “আজ শোনা।”

তারা শোনে—ঘরের শব্দ, বাইরে শহরের শব্দ, নিজেদের শ্বাস। এই শোনাটাই তাদের আলাদা নীরবতার মিল।

কিছুক্ষণ পর অয়ন উঠে দাঁড়াল। জানালার কাছে গেল না। বরং টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। দূরত্বটা বদলাল—কিন্তু বাড়ল না।

— “তুমি কি চাইছ—আমি কাছে আসি?”
অয়ন জিজ্ঞেস করল।
প্রশ্নটা খুব ধীর, খুব পরিষ্কার।

মায়া তাকাল।
— “না,”
সে বলল।
— “আমি চাই—তুমি ঠিক জায়গায় থাকো।”

অয়ন মাথা নেড়াল।
এই মাথা নেড়ানোটা প্রতিশ্রুতি নয়—সম্মতি।

রাত আরও গভীর। চায়ের কাপ ফাঁকা। কেউ তুলল না। ফাঁকা কাপও আজ দরকারি—শেষ হওয়ার চিহ্ন।

— “আজকেরটা ঠিক আছে,”
মায়া বলল।

— “কারণ আমরা কিছু বাড়াইনি,”
অয়ন বলল।

এই বাড়াইনি শব্দটাই তাদের শক্তি। বাড়াতে গেলে দায়িত্ব বাড়ে; দায়িত্ব বাড়লে নীরবতা ভাঙে।

১০

হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। ঘর অন্ধকার। জানালার বাইরের আলো ঢুকছে সামান্য। অন্ধকারে শব্দগুলো পরিষ্কার শোনা যায়।

মায়া স্থির। অয়নও। কেউ নড়ে না।

— “ভয়?”
অয়ন ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

— “না,”
মায়া বলল।
— “অন্ধকারে সীমা আরও স্পষ্ট।”

এই কথাটা অয়ন বুঝল। অন্ধকারে চোখ কম দেখে—মন বেশি।

১১

মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালাল না কেউ। তারা এই অন্ধকারটুকু থাকতে দিল। কিছু অন্ধকার দরকার হয়—নিজেকে ঠিক জায়গায় রাখার জন্য।

অয়ন ধীরে সোফায় বসল। দূরত্ব আগের মতোই। অন্ধকারে দূরত্ব মাপা যায় না—তাই তারা স্থির।

— “আমরা কি খুব অদ্ভুত?”
মায়া বলল।

— “হয়তো,”
অয়ন বলল।
— “কিন্তু নিরাপদ।”

এই নিরাপদ শব্দটা মায়ার কাঁধ হালকা করল।

১২

বিদ্যুৎ ফিরে এলো। আলো জ্বলল। ঘর আগের মতো। কিন্তু অন্ধকারের স্মৃতি থেকে গেল—নীরব, সংযত।

— “আজ এখানে থামি,”
মায়া বলল।

— “থামা মানেই শেষ না,”
অয়ন বলল।
— “শুধু ঠিক জায়গা।”

১৩

তারা উঠে দাঁড়াল। অয়ন ব্যাগ নিল। দরজার কাছে থামল। এই থামাটাই সবচেয়ে ভারী মুহূর্ত। কিন্তু তারা জানে—এই ভার বহনযোগ্য।

— “কাল?”
অয়ন জিজ্ঞেস করল।

— “কাল,”
মায়া বলল।
এই কাল কোনো পরিকল্পনা নয়—ধারাবাহিকতা।

১৪

দরজা খুলে অয়ন বেরোল। মায়া দরজা বন্ধ করল। ঘর আবার নীরব। কিন্তু এই নীরবতা খালি না। একই ঘরে আলাদা নীরবতা তারা ভাগ করে নিয়েছে—এটাই যথেষ্ট।

১৫

মায়া জানালার কাছে গেল। আলো কমাল। আজ ফোন খুলল না। আজ কোনো মেসেজ দরকার নেই। কারণ আজকের নীরব স্পর্শ শব্দ ছাড়াই সম্পূর্ণ।

বিছানায় শুয়ে সে ভাবল—
একই ঘরে থাকলে সবসময় কাছাকাছি হতে হয় না।
কখনো আলাদা নীরবতাই সবচেয়ে কাছের জায়গা।

চোখ বন্ধ হলো।
রাত ঠিক জায়গায় থামল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *