একই ছাদের নিচে

একই ছাদের নিচে থাকা মানেই সবসময় কাছাকাছি থাকা নয়।
কিন্তু একই ছাদের নিচে থাকাই আবার শেখায়—কীভাবে ধীরে ধীরে কাছাকাছি আসতে হয়।

নন্দিতা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছিল। গ্যাসে দুধ বসানো, চুলোর পাশে রাখা কড়াইতে সবজি। সন্ধ্যার আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকছে—নরম, ধীর। এই সময়টায় ঘরটা আলাদা লাগে। দিনের ব্যস্ততা পেছনে পড়ে থাকে, রাত এখনো পুরো নামেনি।

ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা দশ।

আজ অভির ফিরতে দেরি হয়েছে।
নন্দিতা জানে—এই দেরিগুলো এখন আর অজানা না। অফিস, ট্রাফিক, দায়িত্ব—সব মিলিয়ে সময় সরে যায়। তবু তার ভেতরে কোথাও একটা অদ্ভুত খালি জায়গা তৈরি হয়, যেটা সে নিজেও ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারে না।

তাদের বিয়ে হয়েছে আট বছর।

আট বছর মানে অনেক কিছু।
শুরুর উত্তেজনা, প্রথম সংসার, প্রথম ঝগড়া, প্রথম বোঝাপড়া—সব পেরিয়ে এখন তারা এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে সম্পর্কটা আর প্রদর্শনের নয়, দায়িত্বের।

দিনে তারা দু’জনেই আলাদা মানুষ।
নিজ নিজ কাজ, নিজ নিজ চাপ।

কিন্তু রাতে—এই ঘরটায়—তারা স্বামী–স্ত্রী।

এই ঘরটাই তাদের মিলনস্থল।

দরজার শব্দ হলো।

নন্দিতা কড়াই নামাল।
— “এলে?”
সে জিজ্ঞেস করল।

— “হ্যাঁ,”
অভি বলল।
জুতোর শব্দ, ব্যাগ রাখার আওয়াজ।

সে রান্নাঘরে ঢুকল না সঙ্গে সঙ্গে। আগে হাতমুখ ধুয়ে এল। এই ছোট ছোট নিয়মগুলো এখন তাদের জীবনের ছন্দ।

— “খুব দেরি,”
নন্দিতা বলল।

— “জানি,”
অভি বলল।
— “আজ কাজটা টেনে গেল।”

এই টেনে গেল কথাটা নন্দিতার পরিচিত। সে আর প্রশ্ন করল না। প্রশ্ন করলে উত্তর আসবে, কিন্তু ক্লান্তি কমবে না।

তারা টেবিলে বসল। দু’জনের মাঝে পরিচিত দূরত্ব। খুব কাছেও না, খুব দূরেও না। এই দূরত্বটা তারা শিখে নিয়েছে—এটা ঝগড়ার ফল না, এটা অভ্যাসের।

— “আজ তরকারিটা ভালো হয়েছে,”
অভি বলল।

নন্দিতা হালকা হাসল।
— “কারণ আজ মনটা শান্ত ছিল।”

— “কী করে?”
অভি জানতে চাইল।

— “নিজের সঙ্গে সময় নিয়ে,”
নন্দিতা বলল।

অভি মাথা নেড়াল।
এই মাথা নেড়ানোটা বোঝাপড়ার।

খাওয়ার সময় খুব বেশি কথা হলো না।
এই চুপচাপটা অস্বস্তিকর নয়। বরং দরকারি।

বিয়ের শুরুর দিকে তারা খাওয়ার টেবিলে গল্প করত। এখন গল্পগুলো অন্য জায়গায় থাকে—মাঝে মাঝে বেরোয়, মাঝে মাঝে না।

খাওয়া শেষ হলে অভি প্লেট তুলে নিল।
— “আমি ধুয়ে দিচ্ছি,”
সে বলল।

নন্দিতা থামাল না।
এই সহযোগিতাগুলো তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি।

রাতে তারা সোফায় বসল। টিভি বন্ধ। আজ কোনো সিরিজ চালানোর ইচ্ছে নেই। জানালার বাইরে শহরের আলো। ভেতরে নরম আলো।

নন্দিতা চায়ের কাপ হাতে দিল।
অভি নিল।

— “আজ কথা কম?”
অভি জিজ্ঞেস করল।

— “আজ শুনছি,”
নন্দিতা বলল।

এই শুনছি শব্দটা অভির ভালো লাগে। কারণ এখানে অভিযোগ নেই—শুধু উপস্থিতি।

তারা পাশাপাশি বসে। কাঁধ ছুঁয়ে নেই, কিন্তু দূরত্বটাও বাড়তি না। এই মাঝামাঝি জায়গাটাই তাদের সবচেয়ে পরিচিত।

— “আমরা কি বদলে গেছি?”
অভি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

এই প্রশ্নটা নতুন না।
কিন্তু প্রতিবার আলাদা লাগে।

নন্দিতা ভেবে বলল—
— “হ্যাঁ।
কিন্তু খারাপভাবে না।”

— “কীভাবে?”
অভি জানতে চাইল।

— “এখন আমরা চুপ থাকতে পারি,”
নন্দিতা বলল।
— “আগে সেটা পারতাম না।”

অভি হেসে ফেলল।
— “ঠিক।”

বদল মানে দূরে যাওয়া নয়।
বদল মানে—ভিন্নভাবে কাছাকাছি থাকা।

নন্দিতা অভির হাতের দিকে তাকাল। হাতটা সোফার কিনারায়। খুব কাছে। সে হাত বাড়াল না। অভিও না।

এই না-বাড়ানো হাতটাই তাদের নীরব স্পর্শ।

রাতে ঘরে গেল তারা। লাইট কম। বিছানার পাশে ল্যাম্প জ্বলছে। নন্দিতা জানালার পর্দা টানল। অভি বিছানায় বসে মোবাইল দেখছিল। কিছুক্ষণ পর ফোন নামিয়ে রাখল।

— “আজ ফোন না দেখলেও চলবে,”
সে বলল।

নন্দিতা তাকাল।
— “ভালো।”

এই ভালো শব্দটা ছোট।
কিন্তু আজ খুব দরকারি।

তারা পাশাপাশি শুয়ে। মাঝখানে সামান্য ফাঁক। এই ফাঁকটা এখন আর ভয় দেখায় না। কারণ তারা জানে—প্রয়োজনে এই ফাঁক কমতেও পারে।

— “তুমি কি কখনো মনে করো—আমরা দূরে যাচ্ছি?”
নন্দিতা জিজ্ঞেস করল।

অভি কিছুক্ষণ চুপ রইল।
তারপর বলল—
— “না।
আমরা স্থির হচ্ছি।”

এই স্থির শব্দটা নন্দিতার বুক হালকা করল।

১০

নন্দিতা পাশ ফিরল। অভির দিকে মুখ। অভি তাকাল। চোখে কোনো তাড়া নেই। এই চোখে তাকানোর অভ্যাসটা তারা আবার নতুন করে শিখছে।

— “আজ কাছে আসব?”
অভি ধীরে জিজ্ঞেস করল।

এই প্রশ্নটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ এখানে অনুমতি আছে।

নন্দিতা মাথা নেড়াল।
— “হ্যাঁ।”

অভি খুব ধীরে কাছে এল। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। হাত রাখল—নরম, নিশ্চিত। এই স্পর্শে কোনো দাবি নেই, শুধু উপস্থিতি।

১১

এই স্পর্শটা তাদের কাছে নতুন না।
কিন্তু আজ আলাদা।

কারণ আজ তারা সময় নিয়ে আছে।
কথা না বলে বোঝার জায়গায়।

নন্দিতা চোখ বন্ধ করল।
এই কাছাকাছিটা নিরাপদ।

১২

কিছুক্ষণ পর অভি থামল।
— “ঠিক আছ?”
সে জিজ্ঞেস করল।

— “হ্যাঁ,”
নন্দিতা বলল।
— “এইভাবে থাকলেই।”

এই থামাটাই তাদের পরিণতির চিহ্ন।

১৩

তারা পাশাপাশি শুয়ে রইল। কথা নেই। শ্বাসের শব্দ। এই শব্দগুলো তাদের পরিচিত। বছরের পর বছর ধরে একে অপরের শ্বাস শোনা—এটাই সংসার।

১৪

নন্দিতা বুঝল—
সব স্বামী–স্ত্রীর গল্প উত্তেজনার নয়।
কিছু গল্প স্থিরতার।

এই স্থিরতাই টিকিয়ে রাখে।

১৫

ঘুম আসার আগে অভি বলল—
— “ধন্যবাদ।”

— “কিসের জন্য?”
নন্দিতা জানতে চাইল।

— “এই ছাদের জন্য,”
অভি বলল।
— “এই থাকার জন্য।”

নন্দিতা হালকা হাসল।
— “আমাদের ছাদটা বড়,”
সে বলল।
— “অনেক কিছু ধরে।”

১৬

আলো নিভে গেল।
ঘর অন্ধকার।
কিন্তু অস্বস্তিকর নয়।

একই ছাদের নিচে—
দু’জন মানুষ
নিজেদের মতো
একসাথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *