কথা না বলা সন্ধ্যা

সন্ধ্যাটা নামছিল ধীরে।
রাস্তায় আলো জ্বলে উঠছে একে একে, যেন কেউ ইচ্ছে করে তাড়াহুড়ো করছে না। বাতাসে দিনের ক্লান্তি, আর রাতের প্রতিশ্রুতি—দুটোই একসাথে ভাসছে।

ইরা বাসস্টপের বেঞ্চে বসে ছিল।
আজ দেরি হয়ে গেছে। অফিস থেকে বেরোতেই আকাশের রঙ বদলে গিয়েছিল। নীলচে ধূসর, তার ভেতরে হালকা কমলা। এই সময়টা ইরার খুব চেনা—দিন আর রাতের মাঝখানের ফাঁক।

ফোনটা ব্যাগের ভেতর।
সে বের করেনি।

আজ কথা না বলার সন্ধ্যা।

কথা না বলা মানে কথা না থাকা নয়।
কথা না বলা মানে—যা বলা দরকার নেই, সেটাকে না বলা।

রাহুল এই ব্যাপারটা বোঝে।
ইরা জানে, সে বোঝে।

তাদের পরিচয় খুব সাধারণ। একই বাসে ওঠা-নামা, একই সময়। প্রথমে চোখে চোখ পড়ত, তারপর মাথা নেড়ে সম্ভাষণ। ধীরে ধীরে পাশে বসা, জানালার দিকে তাকিয়ে থাকা।

কথা কম।
উপস্থিতি বেশি।

আজও রাহুল এল।
ইরার পাশে বসে পড়ল। খুব স্বাভাবিকভাবে। কোনো প্রশ্ন নেই—আজ পাশে বসব?
এই প্রশ্নটা তাদের কখনো করতে হয়নি।

বাস চলতে শুরু করল।
শহর পিছনে সরে যাচ্ছে। জানালার কাঁচে আলো পড়ছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।

ইরা জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।
রাহুলও।

এই একই দিকে তাকানোটা তাদের নীরব অভ্যাস।

রাহুলের কাঁধটা খুব কাছে।
ইরা টের পেল, কিন্তু সরল না। সে জানে, এই কাছাকাছি থাকাটা অযাচিত নয়। প্রয়োজনীয়ও নয়। শুধু আছে।

বাসে ভিড় বাড়ল। একজন দাঁড়িয়ে হাতল ধরল। সামান্য দোল খেয়ে ইরার হাতটা বেঞ্চের কিনারা থেকে সরে এল—রাহুলের হাতের খুব কাছে।

স্পর্শ হলো না।
কিন্তু দূরত্বটা বুঝে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

রাহুল একটু সরে গেল।
ইরা বুঝল—এটা জায়গা করে দেওয়া, দূরে সরে যাওয়া নয়।

এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলোই তাদের সম্পর্কের ভাষা।

বাসের ভেতর কেউ জোরে কথা বলছিল। কোথাও ফোন বেজে উঠল। তবু তাদের চারপাশে একটা নীরব বলয় তৈরি হয়ে গেল—যেখানে শব্দ ঢুকছে না।

— “আজ দিনটা কেমন গেল?”
রাহুল খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।

এই প্রশ্নটা সে প্রতিদিন করে না।
আজ করেছে, কারণ আজ দরকার ছিল।

— “লম্বা,”
ইরা বলল।
— “কিন্তু ঠিকঠাক।”

রাহুল আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
এই ঠিকঠাক-এর ভেতরে যা আছে, সেটুকু সে সম্মান করল।

বাস থামল সিগন্যালে। বাইরে আলো লাল। ভেতরে মুখগুলো অর্ধেক দেখা যাচ্ছে। এই অর্ধেক আলোয় মানুষ আলাদা লাগে—কম নাটকীয়, বেশি সত্যি।

রাহুল বলল,
— “আজ কথা কম?”

ইরা হালকা হাসল।
— “আজ কথা দরকার নেই।”

রাহুল মাথা নেড়াল।
— “ভালো।”

এই ভালো শব্দটা কোনো মূল্যায়ন না।
এটা সম্মতি।

বাস আবার চলল। হালকা ঝাঁকুনি। ইরা নিজের ব্যাগটা ঠিক করল। ব্যাগের স্ট্র্যাপটা রাহুলের বাহুর খুব কাছে। সে ইচ্ছে করে সরাল না। রাহুলও কিছু করল না।

এই স্থিরতাই তাদের নীরব স্পর্শ।

ইরা ভাবছিল—
এই মানুষটার সঙ্গে তার কখনো বড় কথা হয়নি। ভবিষ্যৎ, সম্পর্ক, নাম—কিছুই না।

তবু কেন সন্ধ্যাগুলো আলাদা লাগে?

হয়তো কারণ এখানে কোনো প্রত্যাশা নেই।
কেউ কারও কাছ থেকে কিছু চাইছে না।

রাহুল জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— “এই আলোটা ভালো।”

ইরা জানত—সে আলো নিয়ে কথা বলছে না।
সে সময় নিয়ে কথা বলছে।

— “হ্যাঁ,”
ইরা বলল।
— “এই সময়টা কথা না বললে ভালো থাকে।”

— “কথা বললে ভেঙে যায়,”
রাহুল যোগ করল।

ইরা তাকাল তার দিকে।
প্রথমবার সন্ধ্যাবেলায়।

রাহুলও তাকাল।
চোখে কোনো প্রশ্ন নেই। শুধু বোঝাপড়া।

বাসে ভিড় কমতে শুরু করল। কয়েকটা স্টপ পরে ইরাকে নামতে হবে। এই জানা থাকাটাই সন্ধ্যাটাকে আরও নরম করে দিল।

শেষ হওয়ার আগেই সবকিছু বেশি অনুভূত হয়।

১০

বাস হঠাৎ ব্রেক করল।
ইরা সামান্য এগিয়ে গেল। তার কনুই রাহুলের হাত ছুঁয়ে গেল—খুব হালকা। এক সেকেন্ডেরও কম।

দু’জনেই স্থির হয়ে গেল।

কেউ সরল না।
কেউ কিছু বলল না।

তারপর রাহুল নিজেই একটু সরে গেল।
এই সরে যাওয়াটা স্পর্শকে অস্বীকার করা নয়—এটা সীমা মানা।

ইরা গভীর নিশ্বাস নিল।
এই এক সেকেন্ডের নীরব স্পর্শটাই সন্ধ্যার সারাংশ।

১১

— “এখানেই নামব,”
ইরা বলল।

রাহুল মাথা নেড়াল।
— “কাল?”

এই কাল শব্দটা কোনো প্রতিশ্রুতি নয়।
শুধু ধারাবাহিকতা।

— “কাল,”
ইরা বলল।

১২

বাস থেকে নামার সময় ইরা একটু থামল।
— “আজকেরটা… আরামদায়ক ছিল।”

রাহুল হালকা হাসল।
— “কারণ আমরা বেশি কিছু করিনি।”

এই বেশি কিছু না করাই তাদের সবচেয়ে বড় কাজ।

১৩

ইরা নেমে গেল।
বাস চলে গেল।

সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল এক মুহূর্ত। সন্ধ্যার আলো এখন প্রায় রাত। দোকানের সাইনবোর্ড জ্বলছে। মানুষের ভিড়।

কিন্তু তার ভেতরে শান্ত।

১৪

হাঁটতে হাঁটতে ইরা বুঝল—
সব স্পর্শ হাতে লাগে না।
কিছু স্পর্শ সময় নেয়।

এই সন্ধ্যাটা তার শরীরে নয়, মনে লেগে আছে।

১৫

বাড়ি ফিরে সে জানালার পাশে দাঁড়াল।
আজ ফোন বের করেনি। কোনো মেসেজের দরকার নেই।

কারণ কিছু কথা না বললেই পূর্ণ হয়।

১৬

রাতে শুয়ে পড়ার সময় তার মনে হলো—
এই সম্পর্কটার কোনো নাম থাকলে হয়তো ভারী হয়ে যেত।

নাম না থাকায় এটা হালকা।
আর হালকাই সবচেয়ে গভীর।

১৭

চোখ বন্ধ করার আগে ইরা মনে মনে বলল—
ধন্যবাদ, এই কথা না বলা সন্ধ্যার জন্য।

কারণ এই সন্ধ্যাগুলোই তাকে শেখায়—
নীরব স্পর্শ কেমন হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *