ঘুমের ঠিক আগের সময়টা অদ্ভুত।
এই সময়টায় মানুষ সবচেয়ে সৎ হয়, আবার সবচেয়ে ভীরুও।
ঈশিতা বিছানায় শুয়ে ছিল।
ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়েছে, শুধু ফোনের স্ক্রিনটাই মাঝে মাঝে আলো দিচ্ছে। জানালার বাইরে রাত গভীর। দূরে কোথাও একটা গাড়ির শব্দ, তারপর আবার নীরবতা।
ঘড়িতে রাত ১২:৫৪।
এই সময়টায় তার অভ্যাস—একটা শেষ মেসেজ পড়া।
লেখা না, শুধু পড়া।
আজও ফোনটা হাতে নিল।
১
সৌমিকের সঙ্গে তার সম্পর্কটা শেষ হয়েছে অনেকদিন।
কাগজে-কলমে, কথায়-বার্তায়—সব দিক দিয়েই শেষ।
কিন্তু রাতে কিছু জিনিস শেষ হয় না।
দিনে ঈশিতা স্বাভাবিক। অফিসে কাজ করে, হাসে, সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে। কেউ বুঝতে পারে না, রাতে সে অন্য একজন হয়ে যায়।
রাতে সে ফিরে যায়—
পুরোনো কথোপকথনে,
শেষ মেসেজে।
২
সৌমিক শেষ যেদিন মেসেজ পাঠিয়েছিল, সেটা ছিল খুব সাধারণ।
“ভালো থেকো।”
এই দুই শব্দ।
কোনো ব্যাখ্যা নেই।
কোনো নাটক নেই।
কিন্তু এই দুই শব্দের ভার ঈশিতাকে আজও টানে।
সে বারবার ওই মেসেজটা পড়ে।
প্রতিবার নতুন করে।
৩
আজও তাই করছিল।
ফোনের স্ক্রিনে আঙুল বুলিয়ে নিচে স্ক্রল করল। পুরোনো দিনের কথোপকথন—হাসি, ছোট ঝগড়া, অপ্রয়োজনীয় ছবি, রাতের “ঘুম আসছে না”।
সব শেষ হয়েছে।
তবু থেকে গেছে।
ঈশিতা চোখ বন্ধ করল।
বিছানার পাশে ঘড়ির টিকটিক শব্দটা স্পষ্ট।
সে ভাবল—
আমি কি এখনও আটকে আছি?
নাকি এটা শুধু অভ্যাস?
৪
শেষ মেসেজটার ঠিক উপরে সৌমিক লিখেছিল—
“আমরা ঠিক জায়গায় থামছি।”
ঈশিতা তখন উত্তর দিয়েছিল—
“হয়তো।”
এই হয়তো শব্দটাই সবকিছু অসম্পূর্ণ করে দিয়েছে।
৫
রাতে মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করে।
দিনে যেগুলো এড়িয়ে যায়, রাতে সেগুলো সামনে এসে দাঁড়ায়।
ঈশিতা নিজেকে জিজ্ঞেস করল—
আমি কি এখনো অপেক্ষা করছি?
উত্তর এল না।
সে ফোনটা বুকের ওপর রাখল।
এই ভঙ্গিটা তার পরিচিত। অনেক রাত এভাবেই কেটেছে।
৬
হঠাৎ ফোনটা কেঁপে উঠল।
নোটিফিকেশন।
ঈশিতার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
নামটা দেখল—
সৌমিক।
রাত ১:০২।
কয়েক সেকেন্ড সে ফোনটা ধরেনি।
এই কয়েক সেকেন্ডে অনেক কিছু ভেবে ফেলল।
শেষমেশ স্ক্রিনে ট্যাপ করল।
মেসেজ।
“এখনো কি ঘুমোতে যাওয়ার আগে ফোনটা হাতে নাও?”
ঈশিতা বসে পড়ল।
এই প্রশ্নটা খুব সাধারণ।
কিন্তু খুব ব্যক্তিগত।
৭
সে উত্তর দিল না সাথে সাথে।
হাতের আঙুল কাঁপছিল।
পাঁচ মিনিট পরে লিখল—
“কখনো কখনো।”
ওপাশ থেকে প্রায় সাথে সাথে উত্তর—
“আমি জানতাম।”
এই জানতাম শব্দটা তাকে একটু ভেঙে দিল।
৮
— “কেন লিখলে?”
ঈশিতা লিখল।
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
“কারণ আজও ঘুম আসছিল না।”
এই উত্তরটার ভেতরে কোনো অনুরোধ নেই।
কোনো প্রত্যাশা নেই।
শুধু স্বীকারোক্তি।
৯
ঈশিতা বিছানায় হেলান দিল।
— “আমাদের তো কথা না বলার কথা,”
সে লিখল।
— “আমি কথা বলতে আসিনি,”
সৌমিক লিখল।
— “আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম—তুমি ঠিক আছ কি না।”
এই প্রশ্নটা ঈশিতা বহুদিন শোনেনি।
— “ঠিক,”
সে লিখল।
তারপর যোগ করল,
— “শিখছি।”
১০
সৌমিক লিখল—
“আমি জানি, এই সময়টা বিপজ্জনক।”
ঈশিতা হেসে ফেলল।
— “রাত সবসময়ই একটু বিপজ্জনক,”
সে লিখল।
— “তাই তো দিনে লিখিনি,”
সৌমিক উত্তর দিল।
এই সীমারেখাটাই ঈশিতার ভালো লাগল।
১১
কিছুক্ষণ তারা চুপ করে থাকল।
এই নীরবতা অস্বস্তিকর না।
— “তুমি কি এখনো শেষ মেসেজটা পড়ো?”
সৌমিক হঠাৎ লিখল।
ঈশিতা ফোনটা নামিয়ে রাখল এক মুহূর্ত।
তারপর আবার তুলে লিখল—
“হ্যাঁ।”
ওপাশ থেকে অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
ঈশিতা বুঝতে পারছিল—এই প্রশ্নটার ওজন ছিল।
১২
অবশেষে সৌমিক লিখল—
“আমি চাইনি সেটা ভার হয়ে থাকুক।”
ঈশিতা চোখ বন্ধ করল।
— “কিন্তু কিছু জিনিস ভার হয়,”
সে লিখল।
— “কারণ তারা শেষ।”
— “আমি জানি,”
সৌমিক লিখল।
— “তাই আজ এটাকে হালকা করতে এলাম।”
১৩
ঈশিতা জানত, এই কথোপকথন টানলে আবার জটিল হবে।
কিন্তু আজ সে পালাতে চাইল না।
— “তাহলে আজ এটুকুই থাক,”
সে লিখল।
— “হ্যাঁ,”
সৌমিক লিখল।
— “ঘুমের আগে শেষ মেসেজ।”
১৪
ঈশিতা লিখল—
“শুভরাত্রি।”
এই শব্দটা বহুদিন ব্যবহার করেনি সে।
সৌমিক উত্তর দিল—
“শুভরাত্রি।
আজ সত্যি।”
এই আজ সত্যি কথাটা ঈশিতাকে শান্ত করল।
১৫
ফোনটা নামিয়ে রেখে ঈশিতা শুয়ে পড়ল।
বুকের ভেতর কোনো অস্থিরতা নেই।
শেষ মেসেজটা আর ভারী লাগছে না।
কারণ কিছু জিনিস আবার শেষ হয়—
শান্তভাবে।
ঘুম আসার আগে ঈশিতা বুঝল—
সব শেষ মানেই শূন্যতা না।
কখনো কখনো শেষ মানেই শান্তি।