কিছু মুখ এত পরিচিত হয় যে, তাদের আর খেয়াল করা হয় না।
আর ঠিক তখনই—হঠাৎ করে—সেই মুখটাই নতুন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
ইলা বাসস্টপের বেঞ্চে বসে ছিল। সকালটা খুব তাড়াতাড়ি শুরু হয়নি, কিন্তু শহরটা জেগে উঠেছে। রাস্তায় লোকজন, গাড়ির শব্দ, দোকান খোলার আওয়াজ—সব মিলিয়ে চেনা দৃশ্য। এই দৃশ্যটা সে বছরের পর বছর দেখে এসেছে।
ঘড়িতে সকাল আটটা দশ।
আজও সে একই সময় বাস ধরবে।
আজও একই রুট।
আজও একই ভিড়।
আর আজও—একই মুখ।
১
রুদ্র।
এই নামটা ইলার কাছে কোনো রহস্য নয়।
পাড়ার ছেলে।
একই স্কুল।
একই কোচিং।
একই বাসস্টপ।
তারা দু’জনেই একে অপরকে চেনে—এ কথা বললে ভুল হবে।
তারা একে অপরকে দেখে এসেছে।
এই দেখা আসার মধ্যে কখনো কৌতূহল ছিল না।
রুদ্র ছিল পরিচিত দৃশ্যের অংশ—গাছ, দোকান, রাস্তার মতোই।
২
রুদ্র প্রতিদিনই একটু দূরে দাঁড়ায়। খুব কাছে না, খুব দূরে না। ইলা কখনো খেয়াল করেনি—আজ খেয়াল করল।
সে লক্ষ্য করল—রুদ্রের চুলে আজ একটু পাক ধরেছে। আগে ছিল না।
সে লক্ষ্য করল—রুদ্র এখন ফোন কম দেখে, বেশি সামনে তাকায়।
এই খেয়াল করাটাই বিপজ্জনক।
কারণ খেয়াল করা মানে—দেখা শুরু করা।
৩
বাস এলো। ভিড়। ইলা উঠল। রুদ্রও উঠল। তারা আলাদা দাঁড়াল। এই আলাদা থাকা তাদের বহু বছরের অভ্যাস।
কিন্তু আজ বাসের ভেতরে হঠাৎ ব্রেক কষল। ইলা সামান্য ভারসাম্য হারাল।
রুদ্র হাত বাড়াল।
ধরেনি।
শুধু সামনে এনে থামিয়েছে।
— “ঠিক আছ?”
সে জিজ্ঞেস করল।
এই প্রশ্নটা নতুন।
এই স্বরটা নতুন।
ইলা মাথা নেড়াল।
— “হ্যাঁ।”
এই হ্যাঁ শব্দটার পর দু’জনেই চুপ করে গেল।
৪
চুপ করে থাকা মানে আগের মতো থাকা না।
এই চুপে একটা অদ্ভুত সচেতনতা আছে।
ইলা বুঝতে পারল—এই প্রথম সে রুদ্রকে একজন মানুষ হিসেবে ভাবছে, শুধু পরিচিত মুখ হিসেবে নয়।
এই ভাবনাটা সে চায়নি।
কিন্তু থামাতেও পারল না।
৫
অফিসের সামনে নেমে ইলা হাঁটতে শুরু করল। রুদ্র অন্যদিকে মোড় নিল। প্রতিদিনের মতো।
আজ ইলা পিছন ফিরে তাকাল।
রুদ্র তাকায়নি।
কিন্তু ইলা জানে—সে জানে।
৬
দিনটা ইলার অদ্ভুতভাবে কাটল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বাসের সেই মুহূর্তটা মনে পড়ছিল। হাতটা কাছে এসে থেমে যাওয়া। ছোঁয়া না হওয়া।
এই না-ছোঁয়াটাই তাকে ভাবাচ্ছে।
৭
ফিরতি পথে বাসস্টপে আবার দেখা।
— “আজ দেরি?”
রুদ্র জিজ্ঞেস করল।
এই প্রশ্নটা আগে কখনো আসেনি।
— “হ্যাঁ,”
ইলা বলল।
— “কাজ ছিল।”
— “হুম,”
রুদ্র বলল।
এই হুম শব্দটা নিরপেক্ষ।
কিন্তু নির্লিপ্ত না।
৮
তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল। মাঝে আধা হাত দূরত্ব। এই দূরত্বটা নতুন করে টের পাওয়া যাচ্ছে।
— “অনেকদিন দেখা,”
রুদ্র হঠাৎ বলল।
ইলা তাকাল।
— “হ্যাঁ।”
— “আমরা কি কখনো কথা বলেছি?”
রুদ্র প্রশ্ন করল।
এই প্রশ্নটা সহজ।
কিন্তু উত্তরটা নয়।
ইলা ভেবে বলল—
— “না।
কিন্তু দেখা তো হয়েছে।”
রুদ্র হালকা হাসল।
— “দেখা সবসময় চেনা নয়।”
এই কথাটার পর ইলা আর কিছু বলল না।
৯
বাস এলো। ভিড়। তারা উঠল। আজ তারা পাশাপাশি দাঁড়াল। ইলা খেয়াল করল—রুদ্র ইচ্ছে করে একটু পাশ ফিরিয়ে আছে, যেন জায়গা দেয়।
এই ছোট যত্নটা অদ্ভুতভাবে তাকে স্পর্শ করল।
১০
বাস চলছিল। জানালার বাইরে শহর। ভেতরে নীরবতা।
— “তুমি কি এখানে অনেকদিন ধরে?”
রুদ্র জিজ্ঞেস করল।
— “জন্ম থেকেই,”
ইলা বলল।
— “আমিও,”
রুদ্র বলল।
এই আমিও শব্দটা তাদের মাঝে একটা মিল টেনে দিল।
১১
ইলা বুঝতে পারল—
পরিচিত মুখ মানে নিরাপত্তা।
কিন্তু সেই মুখ হঠাৎ প্রশ্ন করতে শুরু করলে—নিজের ভেতরও প্রশ্ন জাগে।
১২
নামার সময় রুদ্র বলল—
— “কালও?”
এই এক শব্দে কোনো প্রস্তাব নেই।
কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
শুধু ধারাবাহিকতা।
— “কাল,”
ইলা বলল।
১৩
রাতে ঘুম আসছিল না।
ইলা ভাবল—সে কি কিছু বানিয়ে নিচ্ছে?
নাকি এতদিন ধরে কিছু দেখেনি?
পরিচিত মুখ কি হঠাৎ অচেনা হতে পারে?
১৪
পরের দিন আবার দেখা।
একই সময়।
একই বাসস্টপ।
কিন্তু আজ তারা একে অপরের দিকে তাকাল।
এই তাকানোটা খুব ছোট।
কিন্তু যথেষ্ট।
১৫
পরিচিত মুখের গল্প এমনই হয়।
হঠাৎ শুরু হয় না।
ধীরে ধীরে চোখে পড়ে।
আর ঠিক তখনই—
চেনা পৃথিবীটা
একটু নতুন লাগে।