থামার আগেই থেমে যাওয়া

সব সম্পর্ক ভাঙে না।
কিছু সম্পর্ক থামে—ঠিক সময়েই।

আর সেই থামাটাই তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

সুবর্ণা লাইব্রেরির জানালার পাশে বসে ছিল। বিকেলের আলো বইয়ের তাক ছুঁয়ে এসে মেঝেতে নরম ছায়া ফেলছে। এই লাইব্রেরিটা তার আশ্রয়—শব্দ কম, মানুষ কম, প্রশ্নও কম। এখানে বসলে সে নিজেকে সামলাতে পারে।

আজ তাকে সামলাতে হবে।

ঘড়িতে পাঁচটা দশ।
আর কিছুক্ষণ পরই সে উঠে যাবে।
আর তার আগেই—এই গল্পটার একটা সিদ্ধান্ত দরকার।

দেবাংশুর সঙ্গে তার পরিচয়টা একেবারেই সাধারণ।

একই বিশ্ববিদ্যালয়, আলাদা বিভাগ।
একই লাইব্রেরি, আলাদা টেবিল।
প্রথমে চোখে চোখ পড়ত না। পরে পড়ত—কিন্তু থামত না।

এই না-থামাটাই শুরু।

প্রথম কথা হয়েছিল খুব ছোট্ট কারণে।

সুবর্ণা একটা বই নামাতে পারছিল না। তাকটা উঁচু। দেবাংশু পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে থামল, বইটা নামিয়ে দিল।

— “এইটা?”
সে জিজ্ঞেস করেছিল।

— “হ্যাঁ,”
সুবর্ণা বলেছিল।
— “ধন্যবাদ।”

এই ধন্যবাদ-এর পর আর কিছু হয়নি।
কিন্তু কিছু শুরু হয়েছিল।

এরপর থেকে তারা প্রায় একই সময়ে লাইব্রেরিতে আসতে লাগল। ইচ্ছে করে না—কাকতালীয়ভাবে। এক টেবিল দূরত্ব। মাঝে মাঝে একই বইয়ের শিরোনাম চোখে পড়ত।

কথা কম।
উপস্থিতি বেশি।

এই উপস্থিতিটাই বিপজ্জনক।

দেবাংশু খুব বেশি তাকাত না।
সুবর্ণাও না।

কিন্তু তারা দু’জনেই জানত—দৃষ্টি নামিয়ে রাখাটা ইচ্ছের।

এই ইচ্ছেটাই নিষিদ্ধ আকর্ষণের সূক্ষ্ম রূপ।

একদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। লাইব্রেরি থেকে বেরোতে গিয়ে তারা দু’জনেই থামল। বাইরে জল। ভেতরে নীরবতা।

— “আজ বেরোতে দেরি হবে,”
দেবাংশু বলেছিল।

— “হ্যাঁ,”
সুবর্ণা বলেছিল।
— “এখানে থাকাই ভালো।”

এই থাকাই ভালো কথাটা আলাদা।

সেই দিন তারা এক টেবিলে বসেছিল।
মাঝখানে বই।
এই বইটাই তাদের দেয়াল।

কথা হয়নি।
তবু সব বলা ছিল।

এরপর থেকে নিয়ম তৈরি হলো।

লাইব্রেরিতে দেখা।
কথা কম।
চোখ নামানো।
সময়ে সময়েই উঠে যাওয়া।

এই নিয়মটাই তাদের নিরাপদ রেখেছিল।

কিন্তু নিয়ম বেশিদিন টিকে না, যদি অনুভূতি বাড়ে।

একদিন দেবাংশু বলল—
— “তুমি খুব চুপ করে থাকো।”

সুবর্ণা তাকায়নি।
— “চুপ থাকলে ভুল হয় না।”

— “কিছু ভুল না হলে,”
দেবাংশু বলেছিল,
— “কিছু ঠিকও হয় না।”

এই কথাটা বিপজ্জনক।

সুবর্ণা সেদিনই বুঝেছিল—
এখানে থামা দরকার।

কারণ এই কথাগুলো এগোলে—
দেয়াল ভাঙবে।

১০

সে নিজেই দূরত্ব বাড়াল।
সময় বদলাল।
টেবিল বদলাল।

দেবাংশু বুঝেছিল।
সে প্রশ্ন করেনি।

এই না-প্রশ্ন করাটাই সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

১১

একদিন হঠাৎ দেবাংশু মেসেজ পাঠাল।

“আমি জানি, তুমি থামতে চাইছ।”

এই লাইনটাই তাকে কাঁপিয়ে দিল।

সে উত্তর দিল—

“হ্যাঁ।”

এক শব্দ।
এই এক শব্দেই সব পরিষ্কার।

১২

উত্তর এল—

“আমি সম্মান করি।”

এই সম্মান করি শব্দটা তাকে হালকা করল।

কারণ এখানে কেউ জোর করছে না।

১৩

তারা আর লাইব্রেরিতে একসাথে বসেনি।
কিন্তু দেখা হতো।
দূর থেকে।

এই দূরত্বটাই এখন তাদের নীরব চুক্তি।

১৪

আজ সেই শেষ দিন।

সুবর্ণা জানে—আগামী সপ্তাহে সে অন্য শহরে চলে যাবে। নতুন কাজ, নতুন সময়। এই অধ্যায় এখানেই শেষ।

দেবাংশু আজও লাইব্রেরিতে আছে। আগের জায়গায়। সে তাকায় না। সুবর্ণাও না।

এই না-তাকানোটাই বিদায়।

১৫

সুবর্ণা উঠে দাঁড়াল। ব্যাগ কাঁধে নিল। যাবার আগে এক মুহূর্ত থামল।

দেবাংশু তাকাল না।
কিন্তু বলল—

— “ভালো থেকো।”

এই শব্দদুটোতে কোনো দাবি নেই।
কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

শুধু শুভেচ্ছা।

— “তুমিও,”
সুবর্ণা বলল।

১৬

সে বেরিয়ে গেল।

বাইরে আলো।
ভেতরে শান্তি।

১৭

বাসে বসে সে ভাবল—
এই আকর্ষণটা কখনো স্পর্শে যায়নি।
কখনো নামে যায়নি।

তাই এটা ভাঙেনি।

১৮

সব নিষিদ্ধ আকর্ষণ অপরাধ না।
কিছু নিষিদ্ধ আকর্ষণ দায়িত্ববোধের ফল।

থামতে জানাই পরিণতি।

১৯

সুবর্ণা জানালার বাইরে তাকাল। শহর সরে যাচ্ছে। লাইব্রেরি, বই, নীরবতা—সব পেছনে।

কিন্তু ভেতরে কোনো আফসোস নেই।

কারণ সে জানে—
থামার আগেই থেমে যাওয়াই কখনো কখনো সবচেয়ে সুন্দর শেষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *