থেমে থাকা হাত

সব হাত ছুঁতে চায় না।
কিছু হাত থেমে থাকতে জানে—আর সেই থেমে থাকাই সবচেয়ে গভীর স্পর্শ হয়ে ওঠে।

সন্ধ্যার আলোটা ধীরে ধীরে ম্লান হচ্ছিল। আকাশে রঙ বদলাচ্ছিল—নীল থেকে ধূসর, ধূসর থেকে নরম কালচে। শীত নেই, তবু বাতাসে একটা শিরশিরে অনুভূতি। ইন্দ্রাণী জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, এক হাতে কাঁচে ভর দিয়ে। নিচে রাস্তা—লোকজনের চলাচল, দোকানের আলো, বাসের হেডলাইট—সব মিলিয়ে শহরের পরিচিত দৃশ্য।

আজ তার হাতে সময় আছে।
এই সময়টাই সে সবচেয়ে ভয় পায়—যখন সময় থাকে, আর কথা কমে যায়।

ফোনটা টেবিলে রাখা। স্ক্রিন নিভে। সে জানে, এই নীরবতা ভাঙতে পারে। কিন্তু সে তাড়া দিচ্ছে না। আজ তাড়া দেওয়ার দিন নয়।

রিষভের সঙ্গে তার পরিচয়টা সহজ ছিল না, আবার কঠিনও না। সহজ ছিল কারণ কোনো নাটক ছিল না। কঠিন ছিল কারণ কোনো স্পষ্ট রেখা ছিল না। তারা একই জায়গায় কাজ করে—ভিন্ন বিভাগ, ভিন্ন সময়। দিনের বেলায় দেখা হলে দু’জনেই ভদ্র, সংযত। রাত হলে—রাত হলে কথাগুলো আলাদা হয়ে যেত।

রাতে রিষভ বেশি শোনে।
ইন্দ্রাণী বেশি বলে না।

এই সমীকরণটা অদ্ভুতভাবে কাজ করত।

প্রথম যেদিন তারা একসাথে বসেছিল, সেটা ছিল অফিসের ছাদে। কাজ শেষে হালকা বাতাস, শহরের আলো। কেউ কাউকে আমন্ত্রণ করেনি—দু’জনেই সেখানে ছিল। চায়ের কাপ হাতে। কথাও হয়েছিল, নীরবতাও।

সেই সন্ধ্যায় রিষভ বলেছিল—
— “আমি হাত বাড়াতে পারি।”

ইন্দ্রাণী অবাক হয়নি।
সে শুধু বলেছিল—
— “আমি চাই—তুমি থামতে জানো।”

রিষভ মাথা নেড়েছিল।
সেই থামার মাথা নেড়ানোটা তাদের গল্পের শুরু।

আজ অনেকদিন পর তারা আবার দেখা করবে।
কোনো পরিকল্পনা নেই—শুধু সময়।

ডোরবেল বাজল। ইন্দ্রাণী দরজা খুলল। রিষভ দাঁড়িয়ে—হাতের ভঙ্গি শান্ত, চোখে প্রশ্ন নেই। এই প্রশ্নহীনতা তাকে স্বস্তি দেয়।

— “ভেতরে আসো,”
ইন্দ্রাণী বলল।

— “ধন্যবাদ,”
রিষভ বলল।

এই দুটো শব্দের ভেতরে কোনো বাড়তি অর্থ নেই। আর সেটাই ভালো।

ঘরে আলো কম। ইন্দ্রাণী ইচ্ছে করেই লাইট পুরো জ্বালায়নি। রিষভ জুতো খুলে রাখল, ব্যাগটা চেয়ারের পাশে। তারা দু’জনেই জানে—আজ বেশি কিছু দরকার নেই।

— “চা?”
ইন্দ্রাণী জিজ্ঞেস করল।

— “হালকা,”
রিষভ বলল।

এই হালকা শব্দটা তাদের অভিধানে আলাদা মানে বহন করে—কম চিনি, কম কথা, কম প্রত্যাশা।

চা বানানোর সময় কেটলির শব্দটা ঘর ভরিয়ে দিল। এই শব্দটা নীরবতাকে ভাঙছে না—বরং সময়টাকে ধরে রাখছে। ইন্দ্রাণী কাপগুলো ট্রেতে রাখল। দুটো কাপ, মাঝখানে ফাঁক। এই ফাঁকটাই তাদের সীমা।

তারা সোফায় বসল—পাশাপাশি, কিন্তু গায়ে গা লাগিয়ে না। রিষভের হাতটা সোফার কিনারায়। ইন্দ্রাণীর হাত নিজের কোলে। দূরত্বটা চোখে পড়ার মতো নয়—কিন্তু অনুভবের মতো।

— “দিনটা কেমন?”
রিষভ জিজ্ঞেস করল।

— “ধীর,”
ইন্দ্রাণী বলল।
— “তোমার?”

— “স্থির,”
রিষভ উত্তর দিল।

ধীর আর স্থির—দুটোই আজ ঠিক মানায়।

তারা চা খাচ্ছিল। চায়ের ভাপ উঠছে। রিষভ কাপটা দুই হাতে ধরেছে—এই ভঙ্গিটা ইন্দ্রাণীর পরিচিত। সে জানে, এই ভঙ্গি মানে—আজ কথা কম হবে।

— “আজ হাতগুলো খুব কাছাকাছি,”
ইন্দ্রাণী হঠাৎ বলল।

রিষভ তাকাল।
— “আমি জানি।”

— “তুমি সরবে?”
ইন্দ্রাণী জিজ্ঞেস করল।

রিষভ মাথা নেড়াল।
— “না। থামব।”

এই থামাটাই তাদের চুক্তি।

ঘরের বাইরে বাতাস বাড়ল। জানালার পর্দা নড়ল। ইন্দ্রাণী উঠে পর্দাটা একটু সরাল। আলো ঢুকল—নরম। রিষভ তার দিকে তাকাল না। সে জানে, তাকালে দৃশ্য ভারী হয়ে যেতে পারে।

— “আজ কথা না বললেও চলবে,”
ইন্দ্রাণী বলল।

— “আমি প্রস্তুত,”
রিষভ বলল।

এই প্রস্তুত থাকা—শব্দের নয়, উপস্থিতির।

তারা চুপচাপ বসে রইল। সময় ধীরে চলল। ইন্দ্রাণী টের পেল—রিষভের হাতটা সোফার কিনারা থেকে একটু এগিয়েছে। খুব সামান্য। কিন্তু এখনো ছোঁয়া নেই।

এই মুহূর্তে সে জানে—একটা সিদ্ধান্ত দরকার।

— “থামো,”
ইন্দ্রাণী বলল, খুব নিচু গলায়।

রিষভ থামল।
সঙ্গে সঙ্গে।

এই সঙ্গে সঙ্গে থামাটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেল।

— “ধন্যবাদ,”
ইন্দ্রাণী বলল।

— “কিসের জন্য?”
রিষভ জিজ্ঞেস করল।

— “থেমে থাকার জন্য,”
ইন্দ্রাণী বলল।

রিষভ হালকা হাসল।
— “সব স্পর্শ হাত দিয়ে হয় না।”

এই কথাটা ঘরে স্থির হয়ে রইল।

১০

বিদ্যুৎ একটু ঝিমিয়ে গেল। আলো কমল। তারা কেউ উঠে লাইট বাড়াল না। এই কম আলোতেই আজ থাকা দরকার।

রিষভ ধীরে বলল—
— “আমার হাতটা এখানে থাকলে ঠিক আছে?”

ইন্দ্রাণী তাকাল।
— “হ্যাঁ,”
সে বলল।
— “যতক্ষণ থেমে থাকে।”

রিষভের হাতটা সেখানেই রইল। থেমে। কাছাকাছি। ছোঁয়া ছাড়া।

এই থেমে থাকা হাতটাই আজকের নীরব স্পর্শ।

১১

সময় কেটে গেল। চায়ের কাপ ফাঁকা। কেউ তুলল না। ফাঁকা কাপগুলো আজ শেষের চিহ্ন নয়—থামার চিহ্ন।

— “আজ এখানেই থাক,”
ইন্দ্রাণী বলল।

— “থাকব,”
রিষভ বলল।
— “কিন্তু সীমার ভেতরে।”

— “এটাই যথেষ্ট,”
ইন্দ্রাণী বলল।

১২

রিষভ উঠে দাঁড়াল। ইন্দ্রাণীও। দরজার কাছে এসে তারা থামল। এই থামাটাই সবচেয়ে ভারী—কারণ এখানেই সিদ্ধান্তগুলো চোখে পড়ে।

রিষভ বলল—
— “আমরা ঠিক আছি?”

ইন্দ্রাণী উত্তর দিল—
— “হ্যাঁ। কারণ আমরা কিছু ভাঙিনি।”

১৩

রিষভ দরজা খুলল। বেরোনোর আগে এক মুহূর্ত থামল। তার হাতটা ইন্দ্রাণীর হাতের খুব কাছে। খুব। কিন্তু সে ছোঁয়াল না।

এই না-ছোঁয়াটাই সব বলে দিল।

— “কাল?”
রিষভ জিজ্ঞেস করল।

— “কাল,”
ইন্দ্রাণী বলল।

এই কাল কোনো প্রতিশ্রুতি নয়—একটা সম্ভাবনা।

১৪

দরজা বন্ধ হলো। ঘর আবার নীরব। ইন্দ্রাণী জানালার কাছে গেল। আলো কমাল। আজ ফোনটা খুলল না। আজ কোনো বার্তার দরকার নেই।

সে নিজের হাতের দিকে তাকাল।
এই হাতটা আজ ছোঁয়া পায়নি।
তবু ভরা।

১৫

বিছানায় শুয়ে সে ভাবল—
সব সম্পর্ক এগোয় না।
কিছু সম্পর্ক ঠিক জায়গায় থামে।

আর সেই থামাটাই যদি সম্মান দিয়ে হয়,
তাহলে সেটাই সবচেয়ে নিরাপদ স্পর্শ।

চোখ বন্ধ হলো।
রাত শান্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *