দৃষ্টি নামিয়ে রাখা

কিছু দৃষ্টি চোখে পড়ে না।
কারণ তারা ইচ্ছে করেই নামিয়ে রাখা হয়।

শর্মিলা করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল। বিকেলের আলোটা অফিসের কাঁচে পড়েছে, মেঝেতে লম্বা ছায়া টেনেছে। এই সময়টায় করিডোরটা কম ব্যস্ত—যারা কাজ শেষ করেছে তারা বেরিয়ে যাচ্ছে, যারা বাকি আছে তারা নিজের ভেতরে ঢুকে পড়ছে।

ঘড়িতে চারটা পঞ্চান্ন।

সে জানে—আর কিছুক্ষণ পরই তাকে কনফারেন্স রুমে যেতে হবে। আজকের মিটিংটা ছোট, কিন্তু তার ভেতরের টানটা বড়। কারণ এই মিটিংয়ে একটাই মানুষ আছে, যাকে দেখলে সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে—আর সেই চেষ্টাটাই তাকে ক্লান্ত করে।

অরিন্দম।

অরিন্দমের সঙ্গে শর্মিলার সম্পর্কটা খুব সহজে ব্যাখ্যা করা যায়—
সহকর্মী।
একই লেভেল, আলাদা টিম।
কাজের প্রয়োজনে কথা, প্রয়োজন শেষ হলে আলাদা।

এই সহজ ব্যাখ্যাটা দিনের আলোয় ঠিকঠাক কাজ করে।
কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই কোথাও যেন ফাঁক রয়ে যায়।

এই ফাঁকটাই বিপজ্জনক।

সব শুরু হয়েছিল একেবারে সামান্যভাবে।

একদিন প্রেজেন্টেশনের পর করিডোরে দাঁড়িয়ে শর্মিলা নিজের নোট দেখছিল। হঠাৎ অরিন্দম থামল। খুব কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। সে মাথা নামিয়ে বলেছিল—

— “এই ডেটাটা ঠিক জায়গায় রেখেছ।”

শর্মিলা মাথা তুলেছিল।
চোখে চোখ পড়েনি।
কারণ দু’জনেই দৃষ্টি নামিয়ে রেখেছিল।

এই নামিয়ে রাখাটাই তাদের গল্পের প্রথম লাইন।

এরপর থেকে তারা অদ্ভুতভাবে একে অপরকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল।
এড়িয়ে চলা মানে দূরে থাকা নয়—
এড়িয়ে চলা মানে খেয়াল রাখা

কফি প্যান্ট্রিতে কেউ আগে এলে অন্যজন ঢুকতে দেরি করত।
লিফটে একই সময় হলে কেউ একজন পরের লিফট নিত।

এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলো তাদের নিষিদ্ধ আকর্ষণের নিয়ম।

আজও তাই।

কনফারেন্স রুমে ঢোকার সময় শর্মিলা জানত—অরিন্দম ভেতরে আছে। সে দরজা খুলল, ভেতরে ঢুকল। চোখ নামানো। চেয়ার টানা। বসা।

— “শুরু করি?”
অরিন্দম বলল।

— “হ্যাঁ,”
শর্মিলা বলল।

এই হ্যাঁ-এর ভেতরে কোনো আবেগ নেই। আর সেটাই দরকার।

মিটিং চলল। স্লাইড বদলাল। কথা এগোল। শর্মিলা খেয়াল করল—অরিন্দম কথা বলার সময় তার দিকে তাকাচ্ছে না। স্লাইডের দিকে, নোটের দিকে, জানালার দিকে—কিন্তু তার দিকে না।

এই না-তাকানোটা সম্মান।

— “এই পয়েন্টটা এখানেই থাক,”
অরিন্দম বলল।

শর্মিলা মাথা নেড়াল।
— “ঠিক।”

এই ঠিক শব্দটা তাদের মধ্যে বারবার আসে। কারণ এটা শেষের মতো—আরও বাড়ানোর সুযোগ দেয় না।

মিটিং শেষ। কাগজ গুছানো। চেয়ার ঠেলে ওঠা।

এই উঠার মুহূর্তটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কারণ তখন দৃষ্টি উঠতে চায়।

শর্মিলা ইচ্ছে করে নোটের দিকে তাকিয়ে রইল।
অরিন্দমও।

দু’জনেই জানে—চোখ উঠলেই প্রশ্ন আসবে।
প্রশ্ন এলে দেয়াল নড়বে।

বাইরে বেরিয়ে তারা করিডোরে পাশাপাশি হাঁটছিল। দূরত্ব ঠিকঠাক। খুব কাছেও না, খুব দূরেও না।

— “আজ দেরি?”
অরিন্দম জিজ্ঞেস করল।

— “হ্যাঁ,”
শর্মিলা বলল।
— “কিছু কাজ বাকি।”

— “আমি বেরোচ্ছি,”
অরিন্দম বলল।

— “হ্যাঁ,”
শর্মিলা বলল।

এই কথোপকথনটা সম্পূর্ণ। আর কিছু যোগ করার নেই।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে শর্মিলা চা বানাল। জানালার পাশে দাঁড়াল। বাইরে আলো জ্বলছে। শহর নিজের মতো।

ফোনটা কাঁপল।

অরিন্দম:

“আজ চোখ নামানোটা ঠিক ছিল।”

এই মেসেজটাই সে আশা করছিল—আবার ভয়ও পাচ্ছিল।

কারণ এখানে স্বীকৃতি আছে।
কিন্তু আহ্বান নেই।

সে কিছুক্ষণ লিখল না।
তারপর লিখল—

“তাই তো রাখা।”

এই দুই শব্দে সব সীমা।

উত্তর এল—

অরিন্দম:

“কিছু দৃষ্টি তুললে নষ্ট হয়।”

শর্মিলা চোখ বন্ধ করল।
এই কথাটা সে জানে।
এই কথাটাই তাকে টানে।

১০

তারা আর কথা বাড়াল না।
এই থামাটাই তাদের শক্তি।

রাতে শর্মিলা বুঝল—
এই আকর্ষণটা দৃষ্টির।
কিন্তু সেই দৃষ্টি দেখানোর জন্য নয়—লুকানোর জন্য।

১১

পরদিন অফিসে আবার দেখা।
কোনো ইঙ্গিত নেই।
কোনো গোপন হাসি নেই।

সবাই যেমন দেখে—তেমনই।

এই তেমনই থাকাটাই নিষিদ্ধ আকর্ষণের সাফল্য।

১২

লাঞ্চে ভিড়। টেবিল ভরা। শর্মিলা আলাদা বসেছে। অরিন্দম দূরে। চোখে চোখ পড়েনি। তবু সে জানে—দু’জনেই একে অপরের উপস্থিতি টের পাচ্ছে।

এই টের পাওয়াটাই যথেষ্ট।

১৩

সন্ধ্যায় আবার মেসেজ এল।

অরিন্দম:

“আমরা কি ঠিক করছি?”

এই প্রশ্নটা নতুন।

শর্মিলা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
কিছু প্রশ্ন তৎক্ষণাৎ উত্তর চায় না।

অনেকক্ষণ পরে লিখল—

“আমরা কিছু করছি না।”

এই উত্তরটাই সব পরিষ্কার করে।

১৪

অরিন্দম:

“ঠিক।”

এই ঠিক শব্দটার পর আর কিছু বলার নেই।

১৫

রাতে শর্মিলা বিছানায় শুয়ে ভাবল—
দৃষ্টি নামিয়ে রাখা মানে ভয় পাওয়া না।
মানে নিজের সীমা চেনা।

এই সীমা না থাকলে আকর্ষণটা হয়তো লোভ হয়ে যেত।
লোভ হলে ভেঙে যেত।

১৬

কিছু আকর্ষণ নিষিদ্ধ হয় কারণ তারা ভাঙতে চায় না।
তারা বাঁচতে চায়—নীরবে।

শর্মিলা চোখ বন্ধ করল।
আজ আর কোনো মেসেজ এল না।

এটাই ঠিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *