দেয়াল থাকা ভালোবাসা

কিছু দেয়াল ইট–সিমেন্টের নয়।
কিছু দেয়াল চোখে দেখা যায় না, তবু সবচেয়ে শক্ত।

সায়ন্তনী জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। অফিস বিল্ডিংয়ের কাচের জানালা দিয়ে নিচের শহরটা দেখা যায়—মানুষ, গাড়ি, আলো, শব্দ। সবকিছু চলমান। কিন্তু তার ভেতরে আজ একটা স্থিরতা, যেটা আরামদায়ক নয়—ভারী।

ঘড়িতে সন্ধ্যা ছয়টা পঁয়তাল্লিশ।

এই সময়টা তার কাছে বরাবরই অস্বস্তিকর। দিনের কাজ শেষ, কিন্তু রাত শুরু হয়নি। মাঝখানের এই ফাঁকটাই প্রশ্নে ভরা।

ফোনটা ডেস্কে রাখা।
সে উল্টে রাখেনি।
কারণ আজ এড়িয়ে যেতে চায় না।

নীলয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কটা শুরুই হয়েছিল একটা দেয়াল দিয়ে।

একই অফিস।
একই ফ্লোর।
কিন্তু আলাদা টিম।

এত কাছাকাছি থেকেও তারা আলাদা। এই আলাদা থাকাটাই প্রথমে স্বস্তির ছিল। কোনো জটিলতা নেই, কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই। কাজের প্রয়োজনে কথা, প্রয়োজন শেষ হলে নিজ নিজ জায়গা।

সব ঠিকঠাকই চলছিল—যতক্ষণ না নীলয় তাকে খেয়াল করতে শুরু করল।

খেয়াল করা মানে তাকানো না।
খেয়াল করা মানে—বুঝে ফেলা।

প্রথম যেদিন সায়ন্তনী বুঝেছিল, সেটা খুব সাধারণ একটা দিন।

মিটিং চলছিল। সবাই কথা বলছে। সে একটা প্রেজেন্টেশন দিচ্ছিল। মাঝখানে থামল—একটা স্লাইড ঠিক করতে। তখনই সে টের পেল—নীলয় তার দিকে তাকিয়ে নেই, কিন্তু শুনছে খুব মন দিয়ে।

এই শোনাটা আলাদা।

মিটিং শেষে নীলয় বলেছিল—
— “তুমি একটা জায়গায় থামলে ঠিক সময়ে।”

এই কথাটা কাজের না।
এই কথাটা মনোযোগের।

সায়ন্তনী তখন হেসে বলেছিল—
— “অভ্যাস।”

নীলয় আর কিছু বলেনি।
কিন্তু সেই দিন থেকেই দেয়ালটা বদলাতে শুরু করে।

দেয়ালটা ভাঙেনি।
পাতলা হয়েছে।

তারা কফি প্যান্ট্রিতে একসাথে পড়ত। কথা কম। চোখে চোখ পড়লে মাথা নেড়ে সম্ভাষণ। কোনো বাড়তি থামা নেই।

এই বাড়তি না থামাটাই নিষিদ্ধ আকর্ষণের প্রথম নিয়ম।

আজও প্যান্ট্রিতে দেখা হলো।

— “আজ দেরি?”
নীলয় জিজ্ঞেস করল।

— “হ্যাঁ,”
সায়ন্তনী বলল।
— “কাজটা টেনে গেল।”

নীলয় মাথা নেড়াল।
— “কখনো কখনো টানা কাজ ভালো।”

এই কথাটা দ্ব্যর্থক।
কিন্তু সায়ন্তনী সেটা ভাঙল না।

— “হ্যাঁ,”
সে বলল।
— “যতক্ষণ সীমা জানা থাকে।”

নীলয় তাকাল।
এই তাকানোটা দীর্ঘ না—তবু ভারী।

— “সীমা দরকার,”
সে বলল।
— “না হলে দেয়াল ভেঙে যায়।”

এই দেয়াল শব্দটাই আজকের প্রথম স্বীকারোক্তি।

সন্ধ্যায় তারা দু’জনেই অফিস ছাড়ল আলাদা সময়ে।
কিন্তু একই লিফটে।

এই কাকতালীয়তাগুলো বিপজ্জনক।

লিফট নামছে। আয়নায় নিজেদের প্রতিচ্ছবি। কেউ কথা বলছে না।

— “আজ চুপ?”
নীলয় হালকা করে জিজ্ঞেস করল।

— “আজ শুনছি,”
সায়ন্তনী বলল।

— “ভালো,”
নীলয় বলল।
— “শোনা থাকলে কথা কম লাগে।”

লিফট থামল। দরজা খুলল। তারা বেরোল আলাদা দিকে। কোনো ভালো থাকিস নেই। এই না-বলাটাই দেয়ালটাকে অক্ষত রাখে।

রাতে সায়ন্তনী বাড়ি ফিরল।
ঘর ফাঁকা। আলো কম।

ফোনটা হাতে নিল।
নোটিফিকেশন এল—

নীলয়:

“আজকের কথাটা ঠিক জায়গায় থেমেছিল।”

এই মেসেজটাই সে ভয় পাচ্ছিল।

কারণ এখানে কোনো আহ্বান নেই।
কিন্তু স্বীকৃতি আছে।

সে রিপ্লাই দিল না সঙ্গে সঙ্গে।
কিছু আকর্ষণ তৎক্ষণাৎ উত্তর পেলে শক্ত হয়।

সে চা বানাল। জানালার পাশে দাঁড়াল। শহরের আলো। রাত নামছে।

তার মনে পড়ল—
নীলয়ের কথাগুলো সবসময়ই থামে ঠিক জায়গায়।
কখনো এক ইঞ্চিও বেশি যায় না।

এই নিয়ন্ত্রণটাই তাকে টানে।

অনেকক্ষণ পর সে লিখল—

“থামা দরকার ছিল।”

এক লাইন।
ব্যাখ্যা নেই।

উত্তর এলো কিছুক্ষণ পর—

নীলয়:

“থামা মানে দূরে সরে যাওয়া নয়।”

এই লাইনে সায়ন্তনীর বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে উঠল।

কারণ সে জানে—এটা সত্যি।

তারা ফোনে কথা বলল না।
মেসেজেই থাকল।

এই সীমাটাই তাদের নিরাপদ জায়গা।

সায়ন্তনী:

“আমাদের মাঝে দেয়াল আছে।”

নীলয়:

“আমি জানি।”

সায়ন্তনী:

“দেয়ালটা দরকার।”

নীলয়:

“তাই তো ছুঁই না।”

এই ছুঁই না শব্দটা শারীরিক না।
এটা সীমা ছোঁয়ার কথা।

১০

রাত গভীর হলো।
ঘড়িতে এগারোটা।

সায়ন্তনী জানে—এই সময়টায় কথা বাড়ানো সহজ।
তাই সে থামতে চাইল।

সায়ন্তনী:

“আজ এখানেই থাক।”

উত্তর এল সঙ্গে সঙ্গে—

নীলয়:

“ঠিক আছে।”

এই ঠিক আছে কথাটাই দেয়ালটাকে শক্ত করে।

১১

পরদিন অফিসে সব স্বাভাবিক।
কাজ, মিটিং, কাগজ।

কেউ কিছু টের পায় না।
এই না-টের পাওয়াটাই দেয়ালের সাফল্য।

দুপুরে ক্যান্টিনে দেখা হলো। ভিড়। শব্দ।

— “আজ কেমন?”
নীলয় জিজ্ঞেস করল।

— “স্বাভাবিক,”
সায়ন্তনী বলল।

— “স্বাভাবিক ভালো,”
নীলয় বলল।

এই ভালো শব্দটার ভেতরে গত রাতের সব নীরবতা।

১২

দিনের আলোতে তাদের আকর্ষণ লুকিয়ে থাকে।
রাতে সেটা শুধু অনুভূতি হয়ে থাকে।

কোনো স্পর্শ নেই।
কোনো দাবি নেই।

শুধু বোঝা।

১৩

সায়ন্তনী বুঝতে পারল—
এই দেয়ালটা না থাকলে হয়তো সব ভেঙে যেত।
ভেঙে গেলে আকর্ষণও শেষ হতো।

কিছু ভালোবাসা দেয়াল চায়।
কারণ দেয়াল থাকলেই তারা নিরাপদ।

১৪

রাতে আর কোনো মেসেজ এল না।
আজ আর দরকার নেই।

সায়ন্তনী বিছানায় শুয়ে পড়ল।

তার ভেতরে টান আছে—
কিন্তু অপরাধবোধ নেই।

কারণ এই আকর্ষণ সীমা মানে।
এই আকর্ষণ দেয়াল চেনে।

১৫

চোখ বন্ধ করার আগে সে মনে মনে বলল—
এই দেয়ালটা থাকুক।

কারণ সব ভালোবাসা হাত বাড়াতে চায় না।
কিছু ভালোবাসা দূরত্বেই টিকে থাকে।

আর সেই দূরত্বটাই—
নিষিদ্ধ আকর্ষণের সবচেয়ে নিরাপদ রূপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *