নীরব রাতের জানালা

রাত নামলে শহরটা অন্যরকম হয়ে যায়।
দিনের আলোয় যেটা কোলাহল, রাতে সেটা নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। জানালার কাঁচে আলো পড়ে, ছায়া লম্বা হয়, আর মানুষের ভেতরের কথাগুলো জেগে ওঠে।

অনন্যা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

ঘড়িতে রাত বারোটা পনেরো।
এই সময়টায় তার ঘুম আসে না। অনেকদিন ধরেই আসে না। অফিস, মানুষের ভিড়, দিনের কাজ—সব শেষ হয়ে গেলে রাতটাই তার নিজের হয়।

বাইরে রাস্তায় দু–একটা গাড়ি চলে যাচ্ছে। হেডলাইটের আলো জানালার গ্রিলে পড়ছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেমন কিছু মানুষ আসে জীবনে, আলো ফেলে যায়, তারপর সরে যায়।

অনন্যা চায়ের কাপটা হাতে নিল। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে, তবু সে চুমুক দিল। স্বাদটা আর তেমন নেই, কিন্তু উষ্ণতাটা ভালো লাগে।

আজও তার ফোনটা টেবিলে উল্টো করে রাখা।
সে জানে—নোটিফিকেশন এলে মন কেঁপে উঠবে।

কিছু মানুষ থাকে, যাদের মেসেজ না এলেও উপস্থিতি থাকে।

আর্য তেমনই একজন।

আর্যের সঙ্গে তার পরিচয় খুব সাধারণ।
কোনো নাটকীয়তা নেই।
একই অফিস, ভিন্ন টিম।
দিনে দু–একবার চোখে চোখ পড়া, হালকা মাথা নেড়ে সম্ভাষণ।

কিন্তু রাতে—রাতে ব্যাপারটা আলাদা।

রাতে অনন্যার মনে হতো, কেউ একজন আছে, যে এই সময়টায় জেগে থাকে। ঠিক যেমন সে জেগে থাকে।

কখনো কখনো রাত একটার দিকে একটা ছোট মেসেজ আসত—

“ঘুম আসছে?”

এই দুইটা শব্দে কোনো দাবি নেই।
কোনো প্রশ্নের চাপ নেই।
শুধু উপস্থিতি।

অনন্যা কখনো সাথে সাথে উত্তর দিত, কখনো দেরিতে।
কিন্তু উত্তর দিত।

কারণ এই কথোপকথনগুলো দিনের আলোতে মানায় না।
এগুলো রাতের।

আজ মেসেজ আসেনি।

অনন্যা আবার জানালার দিকে তাকাল। আকাশ পরিষ্কার। চাঁদ নেই, কিন্তু আলো আছে। শহরের আলো।

সে সোফায় বসল। পায়ের কাছে একটা কম্বল টেনে নিল। রাতে তার ঠান্ডা লাগে। শীত না থাকলেও, শরীর যেন নিজেই উষ্ণতা খোঁজে।

ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিন জ্বলে উঠল।
নতুন কিছু নেই।

সে নিজেকে বলল—
আজ হয়তো কথা হবে না।

এই ভাবনাটাই তাকে অদ্ভুতভাবে শান্ত করল।

কিছু সম্পর্ক এমন হয়, যেগুলো না থাকলেও ভর করে থাকে।

প্রথম যেদিন রাতে কথা হয়েছিল, সেটা ছিল হঠাৎ।

অনন্যা সেদিন অনেক দেরি করে অফিস থেকে ফিরেছিল। ক্লান্ত, বিরক্ত। ঘুম আসছিল না। ঠিক তখনই মেসেজ—

“আজ অফিসে তোমাকে একটু আলাদা লাগছিল।”

সে অবাক হয়েছিল।
দিনে কেউ খেয়াল করে না, রাতে কেউ খেয়াল করে।

সে লিখেছিল—

“রাতে মানুষ আলাদা হয়।”

আর্য উত্তর দিয়েছিল—

“হ্যাঁ। রাতে মানুষ কম লুকোয়।”

এই কথাটার পর থেকেই যেন একটা নীরব চুক্তি তৈরি হয়ে গেল।

রাত হলে কথা হবে।
দিনে নয়।

রাতে তাদের কথাগুলো খুব সাধারণ।

— “আজ কী করছিলে?”
— “চা খাচ্ছি।”
— “জানালার পাশে?”
— “হ্যাঁ।”

এই ছোট ছোট প্রশ্নের মধ্যে একটা ছন্দ ছিল। কোনো গভীর প্রেমের ঘোষণা নয়, কোনো ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নয়।

শুধু বর্তমান।

অনন্যার ভালো লাগত, কারণ এখানে তাকে কিছু প্রমাণ করতে হয় না। সুন্দর দেখাতে হয় না। শক্ত হতে হয় না।

রাতে সে শুধু মানুষ।

আজ আবার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনন্যা ভাবছিল—
এই অনুভূতিগুলো কি ভুল?

কিছু না চাওয়া, কিছু না পাওয়া—শুধু থাকা।

ফোনটা আবার হাতে নিল।
এইবার স্ক্রিন জ্বলে উঠল।

একটা মেসেজ।

“আজ জানালার পাশে আছ?”

অনন্যা হেসে ফেলল।
রাত বুঝতে পারে।

সে উত্তর দিল—

“হ্যাঁ। চা ঠান্ডা।”

কিছু সেকেন্ড পর উত্তর—

“ঠান্ডা চা আর জেগে থাকা মানুষ—রাতের নিয়ম।”

অনন্যা সোফায় হেলান দিল।
এই কথাগুলো কোনো প্রেমকাহিনি না।
তবু বুকের ভেতর কিছু একটা নড়ে গেল।

— “কখনো ভয় লাগে?”
আর্য লিখল।

— “কিসের?”
অনন্যা জিজ্ঞেস করল।

— “এই রাতের কাছাকাছি থাকার।”

অনন্যা অনেকক্ষণ কিছু লিখল না।
তারপর লিখল—

“ভয় না।
দায়িত্ব লাগে।”

ওপাশ থেকে উত্তর এলো—

“তাই রাতের কথা দিনে টানি না।”

এই কথাটাই অনন্যাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেল।

কিছু মানুষ জানে, কোথায় থামতে হয়।

রাত আরও গভীর হলো। ঘড়িতে একটা বাজে।
অনন্যার চোখ ভারী হয়ে এলো।

— “ঘুমোচ্ছ?”
আর্য লিখল।

— “আসছে।”
অনন্যা উত্তর দিল।

— “তাহলে শুভরাত্রি।”

এই শুভরাত্রির মধ্যে কোনো অধিকার নেই।
কোনো দাবি নেই।

শুধু যত্ন।

অনন্যা ফোনটা নামিয়ে রাখল। কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল। জানালার বাইরে আলো ধীরে ধীরে নিস্তেজ হচ্ছে।

সে চোখ বন্ধ করল।

রাত শেষ হবে।
দিন আসবে।

কিন্তু কিছু অনুভূতি শুধু রাতেই সত্যি হয়।

ঘুম আসার ঠিক আগে অনন্যার মনে হলো—
এই সম্পর্কটার কোনো নাম নেই।

কিন্তু নাম না থাকাই হয়তো এর সৌন্দর্য।

রাতের অনুভূতিগুলো দিনের আলো সহ্য করতে পারে না।
তাই তারা রাতে থাকে।

নীরবে।
নিরাপদে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *