রাত একটার ফোন

রাত একটার ফোন সাধারণত কেউ করে না।
এই সময়টা জরুরি খবরের না, আবার হালকা গল্পেরও না।
এই সময়টা শুধু তাদের জন্য—
যারা ঘুমোতে পারেনি,
বা ঘুমোতে চায় না।

মিতালী ঘড়ির দিকে তাকাল।
রাত ১:০৭।

ঘরটা অর্ধেক অন্ধকার। টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে, আলোটা দেয়ালে নরম ছায়া ফেলছে। জানালার বাইরে দূরের রাস্তার আলো জ্বলছে—একটানা, নির্লিপ্ত।

তার ফোনটা টেবিলে রাখা।
নীরব।

সে জানত, এই নীরবতা যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে যেতে পারে।

মিতালী রাতের মানুষ।
দিনে সে ঠিকঠাক কাজ করে, হাসে, কথা বলে—সব স্বাভাবিক। কিন্তু রাত নামলেই তার ভেতরের অন্য একটা মানুষ জেগে ওঠে। প্রশ্ন করে, মনে করিয়ে দেয়, ভাবতে বাধ্য করে।

আজও তাই।

সে বই হাতে নিয়েছিল, কিন্তু এক পৃষ্ঠা পড়েও কিছু মনে থাকছে না। শব্দগুলো চোখের সামনে থাকছে, অর্থটা ভেতরে ঢুকছে না।

ফোনটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

কল।

নামটা দেখেই বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল—
আরব

এই নামটা দিনের আলোতে তেমন কিছু না।
কিন্তু রাত একটার ফোনে—এই নামটা আলাদা।

মিতালী এক মুহূর্ত থামল।
তারপর রিসিভ করল।

— “হ্যালো?”

ওপাশ থেকে একটু দেরি।
তারপর ধীর স্বর—

— “ঘুমোচ্ছিলে?”

এই প্রশ্নটা আরব সবসময় করে।
কখনো ধরে নেয় না।

— “না,” মিতালী বলল।
এই “না”-এর মধ্যে কোনো ব্যাখ্যা নেই।

— “আমি জানতাম,” আরব বলল।

মিতালী হালকা হাসল।
— “কীভাবে?”

— “যারা ঠিক সময়ে ঘুমিয়ে পড়ে,” আরব বলল,
— “তারা রাত একটার ফোন ধরে না।”

তারা কেউ প্রথমে কথা শুরু করে না।
দু’জনেই জানে, এই সময়টা তাড়াহুড়োর না।

— “সব ঠিক?”
আরব জিজ্ঞেস করল।

এই প্রশ্নটার মানে শুধু কাজ বা শরীর না।
এই প্রশ্নটার মানে—ভেতর।

— “ঠিক,” মিতালী বলল।
তারপর যোগ করল,
— “অস্বাভাবিকভাবে ঠিক।”

ওপাশে আরব নিঃশ্বাস ছাড়ল।
— “তাহলে ভালো।”

মিতালী সোফায় হেলান দিল। ফোনটা কানে ধরে, চোখ বন্ধ করল। শব্দটা পরিষ্কার—আরব হয়তো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। রাতের শব্দ তার কণ্ঠে লেগে আছে।

আরবের সঙ্গে তার সম্পর্কটা ব্যাখ্যা করা কঠিন।

বন্ধু?
না।

ভালোবাসা?
সে নাম কেউ দেয়নি।

তারা একই শহরে থাকে, কিন্তু খুব কম দেখা হয়। দেখা হলে কথাবার্তা স্বাভাবিক, দিনের মতো। কিন্তু রাত নামলেই সবকিছু বদলে যায়।

রাতে তারা সত্যি হয়।

— “আজ কী করছিলে?”
মিতালী জিজ্ঞেস করল।

— “কিছু না,” আরব বলল।
— “জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম।”

মিতালী হেসে ফেলল।
— “রাতের লোকজন সবাই জানালার পাশে থাকে নাকি?”

— “যারা কথা না বলতে পারে,” আরব বলল,
— “তারা জানালার দিকে তাকায়।”

এই কথাটার পর মিতালী আর কিছু বলল না।
কারণ কিছু কথা চুপ থাকলেই ঠিক থাকে।

রাতের কথোপকথনগুলো অদ্ভুত।
কোনো দিক নেই, কোনো গন্তব্য নেই।
কথা নিজেই নিজের রাস্তা খুঁজে নেয়।

— “কখনো ভয় লাগে?”
আরব হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

— “কিসের?”
মিতালী জানতে চাইল।

— “এই সময়টার,” আরব বলল।
— “রাত একটার কাছাকাছি থাকার।”

মিতালী চোখ খুলল।
সোজা হয়ে বসল।

— “না,” সে বলল ধীরে।
— “এই সময়টা সবচেয়ে সৎ।”

— “সত্যি?”
আরব জিজ্ঞেস করল।

— “হ্যাঁ,” মিতালী উত্তর দিল।
— “কারণ এখানে কিছু হওয়ার কথা নেই।”

এই কথাটায় আরব হেসে ফেলল।
— “ঠিক বলেছ।”

একসময় কথা থামল।
দু’জনেই চুপ।

এই চুপচাপটা অস্বস্তিকর না।
বরং প্রয়োজনীয়।

মিতালী জানত, আরব ফোন রেখে দেয়নি।
শুধু কথা বলছে না।

— “তুমি এখন কী ভাবছ?”
মিতালী জিজ্ঞেস করল।

— “ভাবছি,” আরব বলল,
— “দিনে আমরা এতটা পরিষ্কার নই কেন।”

মিতালী একটু ভেবে বলল—
— “কারণ দিনে সবাই দেখে।”

— “আর রাতে?”
আরব জিজ্ঞেস করল।

— “রাতে কেউ দেখে না,” মিতালী বলল।
— “শুধু শোনে।”

রাত আরও গভীর হলো।
ঘড়িতে ১:৪৩।

— “তুমি কি কখনো এই ফোনটা কাটতে চাও?”
আরব জিজ্ঞেস করল।

এই প্রশ্নটা নতুন না।
কিন্তু প্রতিবার আলাদা লাগে।

— “কখনো না,” মিতালী বলল।
— “কারণ আমরা এটাকে টেনে নেই না।”

— “দিনে আনো না,”
আরব যোগ করল।

— “না,”
মিতালী বলল।
— “দিনে এটার দরকার নেই।”

এই সীমারেখাটাই তাদের নিরাপদ রাখে।

— “তুমি জানো,”
আরব হঠাৎ বলল,
— “আমি যদি কখনো রাত একটার ফোন করা বন্ধ করি—”

— “আমি বুঝব,”
মিতালী মাঝখানে থামিয়ে দিল।

— “কী বুঝবে?”
আরব জিজ্ঞেস করল।

— “যে সময় বদলেছে,”
মিতালী বলল।
— “মানুষ নয়।”

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর আরব বলল—
— “তুমি ভয় পাও না?”

— “না,”
মিতালী বলল।
— “কারণ কিছু জিনিস চিরস্থায়ী না হলেই সুন্দর।”

রাত প্রায় দুইটা।
মিতালীর চোখ ভারী হয়ে আসছে।

— “ঘুম আসছে,”
সে বলল।

— “তাহলে রাখি?”
আরব জিজ্ঞেস করল।

— “হ্যাঁ,”
মিতালী বলল।
তারপর একটু থেমে যোগ করল—
— “আজকেরটা ভালো ছিল।”

— “কারণ আমরা কিছু বাড়াইনি,”
আরব বলল।

— “হ্যাঁ,”
মিতালী হেসে বলল।
— “শুধু ছিলাম।”

— “শুভরাত্রি,”
আরব বলল।

— “শুভরাত্রি,”
মিতালী বলল।

কল কেটে গেল।

মিতালী ফোনটা নামিয়ে রাখল। ঘরে নীরবতা ফিরল। কিন্তু এই নীরবতা খালি না।

সে জানালার দিকে তাকাল। দূরে আলো জ্বলছে। শহর এখনো জেগে আছে—কিন্তু তার রাত শেষ।

১০

ঘুমোতে যাওয়ার আগে মিতালীর মনে হলো—
এই সম্পর্কটার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

কিন্তু ভবিষ্যৎ না থাকাই হয়তো এর সবচেয়ে বড় শক্তি।

রাত একটার ফোনগুলো কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না।
কিন্তু বোঝায়—
এই মুহূর্তে, এই রাতে,
তুমি একা নও।

এই অনুভূতিটাই যথেষ্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *