আধো অন্ধকার ঘর

রাত হলে ঘরটা বদলে যায়।
দিনের আলোয় যেটা শুধু একটা ঘর, রাতে সেটা হয়ে ওঠে একটা অনুভূতি।

তন্বী ঘরের সুইচটা পুরো জ্বালায়নি।
শুধু টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে—হালকা হলুদ আলো। দেয়ালের কোণে ছায়া পড়েছে, ছায়াগুলো যেন নড়ছে, আবার থেমে যাচ্ছে।

এই আধো অন্ধকার ঘরটাই তার পছন্দ।

ঘড়িতে রাত বারোটা চল্লিশ।
এই সময়টায় ফোন কল খুব কম আসে। কিন্তু তন্বী জানে—আজ আসতে পারে।

সে সোফায় বসে পা দুটো ভাঁজ করে রেখেছে। চুল আলগা করে বাঁধা। গায়ে হালকা শাল। শীত নেই, তবু উষ্ণতা দরকার।

ফোনটা টেবিলে রাখা। স্ক্রিন নিভে আছে।
নীরব।

এই নীরবতার মধ্যেই সে অপেক্ষা করছিল।

নীলয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কটা কখনো স্পষ্ট ছিল না।
স্পষ্ট হলে হয়তো সহজ হতো।
কিন্তু কিছু সম্পর্ক সহজ হওয়ার জন্য তৈরি হয় না।

তারা আগে একই বাড়িতে থাকত—ভিন্ন ফ্ল্যাটে। লিফটে দেখা, সিঁড়িতে হালকা কথা। দিনের আলোয় খুব সাধারণ। কিন্তু রাত হলে ব্যাপারটা আলাদা হয়ে যেত।

রাতে নীলয় হেঁটে বেরোত বারান্দায়।
তন্বী জানালার পাশে দাঁড়াত।

কখনো চোখে চোখ পড়ত।
কখনো শুধু আলো দেখা যেত।

এই আলো দেখাটাই যেন একধরনের কথা বলা।

আজ নীলয় বাইরে আছে।
শহরের অন্য প্রান্তে।

তন্বী জানে—আজ সে ফোন করবে।

কারণ নীলয় এমনই।
দূরে থাকলে কথা বলে, কাছে থাকলে চুপ।

হঠাৎ ফোনটা কেঁপে উঠল।

কল।

নামটা দেখেই তন্বী গভীর নিশ্বাস নিল—
নীলয়

সে রিসিভ করল।

— “হ্যালো?”

ওপাশে একটু নীরবতা।
তারপর পরিচিত গলা—

— “ঘরে আলো কম?”

এই প্রশ্নটা অদ্ভুত।
কিন্তু নীলয় সবসময় এমন প্রশ্নই করে।

— “হ্যাঁ,” তন্বী বলল।
— “পুরো আলো জ্বালাইনি।”

— “ভালো,” নীলয় বলল।
— “আধো অন্ধকার ঠিক লাগে।”

তারা কেউ জিজ্ঞেস করে না—কেন ফোন।
এই প্রশ্নটার দরকার পড়ে না।

— “কোথায় আছ?”
তন্বী জিজ্ঞেস করল।

— “একটা ঘরে,”
নীলয় বলল।
— “এখানেও আলো কম।”

তন্বী চোখ বন্ধ করল।
এই কাকতালীয়তাগুলো তাদের গল্পের অংশ।

— “ক্লান্ত?”
সে জিজ্ঞেস করল।

— “হ্যাঁ,”
নীলয় বলল।
— “কিন্তু ভালো।”

এই কিন্তু ভালো কথাটা তন্বী বুঝতে পারে।
কারণ রাত মানুষকে ক্লান্ত করে না—হালকা করে।

তারা কথা বলছিল ধীরে।
কোনো তাড়া নেই।

— “ঘরটা কেমন?”
নীলয় জিজ্ঞেস করল।

— “চুপচাপ,”
তন্বী বলল।
— “আধো অন্ধকারে শব্দ কম শোনা যায়।”

— “আর অনুভূতি?”
নীলয় জিজ্ঞেস করল।

এই প্রশ্নটা একটু আলাদা।
তন্বী থামল।

— “অনুভূতি বেশি,”
সে বলল।
— “কারণ চোখ ঠিকমতো দেখে না।”

নীলয় হেসে ফেলল।
— “তাই তো।”

তন্বী উঠে জানালার কাছে গেল। বাইরে শহরের আলো। দূরের ফ্ল্যাটগুলো অন্ধকার–আলো মিশে আছে। কেউ কেউ জেগে আছে, কেউ ঘুমোচ্ছে।

— “তুমি কি জানো,”
নীলয় হঠাৎ বলল,
— “এই আধো অন্ধকারে মানুষ বেশি সৎ হয়?”

— “হয়তো,”
তন্বী বলল।
— “কারণ এখানে কেউ দেখতে পায় না।”

— “ঠিক,”
নীলয় বলল।
— “শুধু অনুভব করা যায়।”

এই কথাটার পর তারা দু’জনেই চুপ।

নীরবতা তাদের ভয় দেখায় না।
নীরবতাই তাদের ভাষা।

— “তুমি কি কখনো ভাবো,”
নীলয় আবার বলল,
— “আমরা যদি দিনে এমন কথা বলতাম?”

তন্বী হালকা হেসে ফেলল।
— “না,”
সে বলল।
— “দিনে এগুলো মানায় না।”

— “কেন?”
নীলয় জিজ্ঞেস করল।

— “কারণ দিনে আলো বেশি,”
তন্বী উত্তর দিল।
— “আলোয় মানুষ নিজেকে সামলায়।”

নীলয় ধীরে বলল—
— “আর রাতে?”

— “রাতে মানুষ নিজেকে ছেড়ে দেয়,”
তন্বী বলল।

ঘড়িতে একটা বেজে গেছে।
ঘরটা আরও নীরব।

নীলয় বলল—
— “আমি জানি না, এটা কী।”

এই স্বীকারোক্তিটা খুব সরল।
তন্বী বুঝল—সে সম্পর্কের নাম জানতে চাইছে না। সে শুধু নিশ্চিত হতে চাইছে, সে একা নয়।

— “নাম দেওয়ার দরকার নেই,”
তন্বী বলল।
— “সব কিছুর নাম থাকলে টিকে না।”

নীলয় কিছু বলল না।
কিন্তু তার নিঃশ্বাসটা তন্বী শুনতে পেল—ধীর, গভীর।

— “তুমি এখন কী করছ?”
নীলয় জিজ্ঞেস করল।

— “তোমার কথা শুনছি,”
তন্বী বলল।

এই কথাটা খুব সাধারণ।
কিন্তু রাতের আধো অন্ধকারে—এটা অনেক।

— “আমি জানি,”
নীলয় বলল,
— “এই ফোনটা কাটলে সব আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।”

— “হ্যাঁ,”
তন্বী বলল।
— “কিন্তু এখনটা সত্যি।”

এই এখনটাই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

রাত আরও গভীর হলো।
তন্বীর চোখ একটু ভারী।

— “ঘুম আসছে?”
নীলয় জিজ্ঞেস করল।

— “আসছে,”
তন্বী বলল।
— “কিন্তু এখনো না।”

— “তাহলে একটু চুপ থাকি,”
নীলয় বলল।

তারা চুপ থাকল।
ফোনে শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ।

এই নীরবতা কোনো অস্বস্তি তৈরি করল না।
বরং ঘরটাকে আরও কাছের করে দিল।

১০

কিছুক্ষণ পর তন্বী বলল—
— “নীলয়?”

— “হ্যাঁ?”

— “এই আধো অন্ধকার ঘরগুলো ভালো,”
সে বলল।
— “কারণ এখানে কিছু লুকোতে হয় না।”

নীলয় ধীরে বলল—
— “আমি জানি।”

১১

— “শুভরাত্রি বলব?”
নীলয় জিজ্ঞেস করল।

— “হ্যাঁ,”
তন্বী বলল।
— “এখন ঠিক সময়।”

— “শুভরাত্রি,”
নীলয় বলল।

— “শুভরাত্রি,”
তন্বী উত্তর দিল।

কল কেটে গেল।

১২

তন্বী ফোনটা নামিয়ে রাখল।
ঘরটা আবার নীরব।

সে ল্যাম্পের আলোটা আরও কমাল।
ঘরটা এখন সত্যিই আধো অন্ধকার।

বিছানায় শুয়ে সে ভাবল—
এই সম্পর্কটার কোনো ভবিষ্যৎ সে জানে না।
কিন্তু এই রাতগুলো তার।

রাতের অনুভূতিগুলো দিনের আলো সহ্য করে না।
তাই তারা আধো অন্ধকারে থাকে।

নিরাপদে।
নীরবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *