দূরত্বের ভেতর কাছে

দূরত্ব সবসময় আলাদা করে না।
কখনো কখনো দূরত্বই কাছাকাছির ভাষা হয়ে ওঠে।

নভেরা বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। নিচে শহরটা রাতের মতো নিঃশব্দ নয়—তবু তার নিজের ভেতরে একটা অদ্ভুত নীরবতা। এই নীরবতা সে চেনে। বহুদিন ধরেই চেনে।

ঘড়িতে রাত এগারোটা আটচল্লিশ।
এই সময়টা তার কাছে দিনের শেষ নয়—বরং দিনের সত্যি শুরু।

ফোনটা হাতে নিল না সে।
আজ ইচ্ছে করে দূরে থাকবে।

আরিফের সঙ্গে তার সম্পর্কটা শুরু হয়েছিল দূরত্ব দিয়েই।

দু’জনের বাড়ি আলাদা শহরে। কাজের কারণে যোগাযোগ—ইমেইল, কল, মাঝে মাঝে ভিডিও মিটিং। দিনের আলোয় সবকিছু ছিল নিয়মমাফিক। কথা ছিল কাজের, সময় ছিল সীমিত।

কিন্তু রাত এলেই নিয়ম ভাঙত।

রাতে আরিফের গলা আলাদা শোনাত।
ধীরে, মেপে, যেন শব্দগুলো বাছাই করে বলছে।

— “আজ আকাশটা কেমন?”
এই প্রশ্নটা প্রথম সে রাতে করেছিল।

নভেরা তখন হেসে ফেলেছিল।
— “তুমি আকাশ দেখছ নাকি আমাকে?”

আরিফ বলেছিল—
— “আকাশ দেখলেই তো মানুষটার কথা মনে পড়ে।”

এই কথাটার পর থেকেই দূরত্ব বদলে গিয়েছিল।

দূরত্বটা তখন আর কিলোমিটারে মাপা যাচ্ছিল না।
এটা সময়ের হয়ে উঠেছিল।

দিনে তারা দূরে।
রাতে কাছাকাছি।

নভেরা জানত—এই কাছাকাছিটা অদ্ভুত। কারণ এখানে কোনো স্পর্শ নেই, কোনো উপস্থিতি নেই। তবু একটা অনুভব আছে—যেটা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু অস্বীকারও করা যায় না।

আজ অনেকদিন পর সে নিজেই দূরে থাকতে চাইল।

কারণ কাছাকাছি থাকাটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠছিল।
ভারী মানে খারাপ না—দায়িত্বের মতো।

নভেরা জানালার কাঁচে আঙুল বুলাল। বাইরে আলোর ফোঁটা। এই আলো আরিফও দেখছে কি না—সে জানে না। কিন্তু মনে হয়, দেখছে।

ফোনটা কেঁপে উঠল।

নভেরা তাকাল না।
সে জানত—কে।

আরিফ সবসময় এই সময়েই কল করে।
কারণ এই সময়টায় মানুষ নিজের ভেতরের দূরত্বটা বুঝতে পারে।

ফোনটা আবার কেঁপে উঠল।

এইবার সে ধরল।

— “হ্যালো।”

— “আজ তোমার গলা আলাদা,”
আরিফ বলল।

এই আলাদা শব্দটা খুব সূক্ষ্ম।
নভেরা জানে—সে বুঝে গেছে।

— “আজ আমি একটু দূরে,”
নভেরা বলল।

— “আমি জানি,”
আরিফ বলল।
— “তাই তো ফোন করেছি।”

এই কথোপকথনটা ঝগড়ার না।
এটা বোঝার।

— “কেন দূরে?”
আরিফ জিজ্ঞেস করল না।
সে শুধু বলল—
— “ঠিক আছে।”

এই ঠিক আছে কথাটার ভেতরে কোনো চাপ নেই।
বরং জায়গা দেওয়া আছে।

নভেরা গভীর নিশ্বাস নিল।
— “আমি চাইছিলাম—আজ আমরা একটু আলাদা থাকি।”

— “দূরে থেকে?”
আরিফ জিজ্ঞেস করল।

— “হ্যাঁ,”
নভেরা বলল।
— “দূরে থেকেও কাছাকাছি থাকা যায় কি না দেখতে।”

আরিফ কিছুক্ষণ চুপ থাকল।
এই নীরবতা ভয়ংকর নয়। বরং প্রয়োজনীয়।

— “দূরত্বটা কেমন?”
সে জিজ্ঞেস করল।

নভেরা ভাবল।
— “শান্ত,”
সে বলল।
— “কারণ এখানে কাউকে টানতে হচ্ছে না।”

— “তাহলে আমি এখানেই থাকি,”
আরিফ বলল।
— “দূরে।”

এই এক লাইনে কতটা বোঝাপড়া।

তারা ফোনে চুপ করে রইল।
কথা নেই, কিন্তু সংযোগ আছে।

নভেরা বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকল। লাইট জ্বালাল না। আধো আলোয় ঘরটা আলাদা লাগে। সে সোফায় বসল। ফোনটা কানে ধরা।

— “তুমি এখন কী করছ?”
আরিফ জিজ্ঞেস করল।

— “বসেছি,”
নভেরা বলল।
— “নিজের সঙ্গে।”

— “আমি শুনছি,”
আরিফ বলল।

এই শুনছি শব্দটা কোনো দাবি না।
শুধু উপস্থিতি।

নভেরা বুঝল—এই মানুষটা তাকে টানছে না।
এই না-টানাটাই তাকে কাছে আনছে।

— “আমরা কি খুব অদ্ভুত?”
নভেরা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

— “হয়তো,”
আরিফ বলল।
— “কিন্তু নিরাপদ।”

এই নিরাপদ শব্দটা তার গায়ে কাঁটা দিল।

তাদের মধ্যে কখনো প্রতিশ্রুতি হয়নি।
কিন্তু একটা অদ্ভুত নিয়ম ছিল—

দিনে কোনো দাবি না।
রাতে কোনো অভিনয় না।

এই নিয়মটাই তাদের দূরত্বকে সহনীয় করেছে।

১০

— “তুমি কি কখনো চাও—আমি কাছে থাকি?”
নভেরা জিজ্ঞেস করল।

এই প্রশ্নটা সে আগে কখনো করেনি।

আরিফ ধীরে বলল—
— “হ্যাঁ।”

নভেরার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল।

— “কিন্তু?”
সে জানতে চাইল।

— “কিন্তু জোর করে নয়,”
আরিফ বলল।
— “আমি চাই—তুমি নিজেই আসো।”

এই কথাটা নীরব স্পর্শের মতো।
কোনো চাপ নেই—তবু গভীর।

১১

নভেরা চোখ বন্ধ করল।
এই প্রথম সে বুঝল—কাছাকাছি মানে একসাথে থাকা নয়।
কাছাকাছি মানে—একই জায়গায় না থেকেও একে অপরকে ছেড়ে না যাওয়া।

১২

ঘড়িতে রাত বারোটা বেজে গেছে।

— “ঘুম আসছে?”
আরিফ জিজ্ঞেস করল।

— “আসবে,”
নভেরা বলল।
— “কিন্তু আজ একটু দেরি।”

— “আমি থাকি,”
আরিফ বলল।

— “দূরে?”
নভেরা হেসে জিজ্ঞেস করল।

— “দূরে,”
আরিফ বলল।
— “কিন্তু ঠিক জায়গায়।”

১৩

নভেরা ফোনটা বালিশের পাশে রাখল।
এইভাবে কথা বলা তার পরিচিত।
শব্দ কম, উপস্থিতি বেশি।

— “আমরা কি ভুল করছি?”
সে হঠাৎ বলল।

— “না,”
আরিফ সঙ্গে সঙ্গে বলল।
— “আমরা কিছু ভাঙছি না।”

এই কথাটা তাকে আশ্বস্ত করল।

১৪

নভেরা জানে—এই সম্পর্কটার কোনো সহজ নাম নেই।
কিন্তু নাম না থাকাই এর সৌন্দর্য।

এখানে কেউ কাউকে দখল করছে না।
শুধু জায়গা করে দিচ্ছে।

১৫

— “শুভরাত্রি বলব?”
আরিফ জিজ্ঞেস করল।

নভেরা একটু থামল।
— “হ্যাঁ,”
সে বলল।
— “আজকের দূরত্বটা ঠিক ছিল।”

— “আমারও,”
আরিফ বলল।

— “শুভরাত্রি,”
নভেরা বলল।

— “শুভরাত্রি,”
আরিফ উত্তর দিল।

১৬

কল কেটে গেল।

নভেরা ফোনটা নামিয়ে রাখল। ঘরে নীরবতা। কিন্তু এই নীরবতা ফাঁকা নয়। সে জানে—দূরত্বের ভেতরেও কেউ আছে।

এই জানাটাই তাকে শান্ত করল।

১৭

বিছানায় শুয়ে সে ভাবল—
সব কাছাকাছি থাকাই স্পর্শ নয়।
কিছু দূরত্বও স্পর্শের মতো কাজ করে।

কারণ তারা বাধ্য করে না।
শুধু বুঝে নেয়।

১৮

চোখ বন্ধ করার আগে নভেরা মনে মনে বলল—
এই দূরত্বটা থাকুক।
কারণ এই দূরত্বই তাকে কাছে থাকতে শিখিয়েছে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *