কিছু অনুভূতি নাম চায় না।
নাম পেলেই তারা ভারী হয়ে যায়।
অনিন্দিতা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
নিচে কলেজ ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা। সন্ধ্যা নামছে, আলো জ্বলছে একে একে। দিনের কোলাহলটা ধীরে ধীরে গুটিয়ে যাচ্ছে।
এই সময়টাই তার সবচেয়ে অস্বস্তিকর।
কারণ এই সময়টায় সে সবচেয়ে বেশি ভাবে।
ফোনটা টেবিলে রাখা। স্ক্রিন নিভে।
সে জানে—আজও নোটিফিকেশন আসবে।
১
অর্কর সঙ্গে তার সম্পর্কটার কোনো নাম নেই।
থাকাও উচিত না।
দিনে তারা খুব স্বাভাবিক।
সহকর্মী—এর বেশি কিছু না।
একই ডিপার্টমেন্ট, আলাদা দায়িত্ব। সভায় মুখোমুখি বসা, ফাইল আদান-প্রদান, প্রয়োজনীয় কথাবার্তা।
কেউ বাইরে থেকে দেখলে বুঝবে না—
এই দু’জনের ভেতরে কিছু চলছে।
কিন্তু রাতে অনিন্দিতা জানে—
সব ঠিক ততটা সরল না।
২
সব শুরু হয়েছিল একেবারে নিরীহভাবে।
একদিন দেরি করে অফিস থেকে বেরোচ্ছিল। লিফটে হঠাৎ আটকে যাওয়া। কয়েক মিনিটের জন্য অচল অবস্থা। আলো কম, জায়গা ছোট।
অর্ক বলেছিল—
— “ভয় পাচ্ছ?”
অনিন্দিতা মাথা নেড়েছিল।
— “না। শুধু অস্বস্তি।”
এই অস্বস্তি শব্দটাই পরে অন্য মানে নিয়ে নেয়।
৩
এরপর থেকে তারা অদ্ভুতভাবে একে অপরকে খেয়াল করতে শুরু করে।
চোখে চোখ পড়লে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া।
কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে যাওয়া।
এই থেমে যাওয়াগুলোই বিপজ্জনক।
কারণ থামা মানে ভাবা।
আর ভাবা মানে সীমার কাছে যাওয়া।
৪
আজও তাই।
অর্ক সন্ধ্যায় একটা মেইল পাঠিয়েছে—পুরোপুরি কাজের। কিন্তু শেষে একটা লাইন—
“কাল যদি সময় পাও, কথা আছে।”
এই কথা আছে—এই দুই শব্দই নিষিদ্ধ।
অনিন্দিতা রিপ্লাই দিয়েছে—
“দেখি।”
এই দেখি শব্দটার ভেতরে সব অনিশ্চয়তা।
৫
রাতে সে নিজের সঙ্গে লড়াই করে।
সে জানে—এই আকর্ষণ ঠিক না।
সে জানে—এটার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
তবু কেন মনে হয়, কেউ একজন আছে যে তার নীরবতা বুঝতে পারে?
ফোনটা কেঁপে উঠল।
মেসেজ।
অর্ক:
“আজ কথা না হলেও চলবে।”
এই লাইনটাই তাকে কাঁপিয়ে দিল।
কারণ এখানে কোনো দাবি নেই।
কোনো চাপ নেই।
শুধু বোঝা।
৬
অনিন্দিতা লিখল না।
ফোনটা নামিয়ে রাখল।
কিছু আকর্ষণ উত্তর দিলে বাড়ে।
চুপ থাকলে টিকে থাকে।
৭
পরদিন অফিসে দেখা হলো।
— “গুড মর্নিং,”
অর্ক বলল।
— “মর্নিং,”
অনিন্দিতা উত্তর দিল।
এই দুটো শব্দের ভেতরে কিছুই নেই—আবার সবকিছু আছে।
মিটিং চলাকালীন একবার চোখে চোখ পড়ল।
দু’জনেই সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরাল।
এই দৃষ্টি সরানোটাই নিষিদ্ধ আকর্ষণের নিয়ম।
৮
লাঞ্চে তারা আলাদা বসেছে।
এই আলাদা বসাটাই নিরাপদ।
কিন্তু নিরাপদ মানেই সহজ না।
অনিন্দিতা খেয়াল করল—সে খাওয়ার মাঝেই থেমে যাচ্ছে। মন অন্য কোথাও।
৯
সন্ধ্যায় অর্ক বলল—
— “আমি বেরোচ্ছি।”
— “হ্যাঁ,”
অনিন্দিতা বলল।
দু’জনেই জানে—এই কথোপকথনটা অসম্পূর্ণ।
কিন্তু অসম্পূর্ণ থাকাই ভালো।
১০
রাতে আবার মেসেজ এল।
অর্ক:
“তুমি ঠিক আছ?”
এই প্রশ্নটা খুব সাধারণ।
কিন্তু খুব বিপজ্জনক।
অনিন্দিতা অনেকক্ষণ ভেবে লিখল—
“ঠিক।”
এক শব্দ।
এই এক শব্দেই সে সীমা টেনে দিল।
১১
অর্ক:
“ভালো।”
এই ভালো শব্দটার মানে—
আমি আর এগোব না।
এই না-এগোনোটাই সবচেয়ে বড় টান।
১২
অনিন্দিতা জানে—
এই আকর্ষণ কোনোদিন প্রকাশ পাবে না।
এটা ছোঁয়ার নয়, নাম দেওয়ার নয়।
এটা শুধু অনুভব করার।
১৩
সে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল।
রাত নেমেছে। আলো কম।
শহর নিজের মতো।
তার মনে হলো—
কিছু আকর্ষণ নিষিদ্ধ বলেই সুন্দর।
কারণ তারা সীমা মানে।
১৪
ফোনটা আর কাঁপল না।
আজ আর কোনো মেসেজ নেই।
অনিন্দিতা বিছানায় শুয়ে পড়ল।
বুকের ভেতরে টান আছে—
কিন্তু অশান্তি নেই।
এই টানটাই নিষিদ্ধ আকর্ষণ।
যা বলা যায় না,
কিন্তু অস্বীকারও করা যায় না।