নাম না থাকা টান

সব অনুভূতির নাম থাকে না।
কিছু অনুভূতি নাম পেলেই নষ্ট হয়ে যায়।

ঋতু জানালার পর্দাটা একটু সরাল। বাইরের আলো ঢুকল—নরম, ধূসর। আকাশে মেঘ, বৃষ্টির কোনো তাড়া নেই। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। এই সময়টা তার কাছে অদ্ভুত—না দিন, না রাত। ঠিক যেমন কিছু সম্পর্ক—না শুরু, না শেষ।

ঘড়িতে ছয়টা পনেরো।

ল্যাপটপ বন্ধ করে সে চেয়ার থেকে উঠল। আজ কাজ শেষ করতে ইচ্ছে করছে না। কাজ শেষ মানেই ভাবার সময় শুরু। আর আজ সে ভাবতে চায় না—তবু ভাব আসে।

ফোনটা ডেস্কে রাখা।
স্ক্রিন নিভে।

সে জানে—এই নীরবতা দীর্ঘ হবে না।

অদ্রির সঙ্গে তার পরিচয়টা পরিকল্পিত ছিল না।
একই প্রজেক্ট, একই ডেডলাইন, একই চাপ।

দিনের আলোয় সবকিছু ছিল পেশাদার। কথা ছিল কাজের, স্বর ছিল মাপা। কেউ কারও জায়গা ছাড়িয়ে যায়নি। এই নিয়মটাই শুরুতে তাদের স্বস্তি দিয়েছিল।

কিন্তু ধীরে ধীরে নিয়মগুলো নিজেই কথা বলতে শুরু করে।

অদ্রি খুব কম কথা বলে।
কিন্তু শোনে গভীরভাবে।

এই শোনাটাই ঋতুকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল।

প্রথম যে দিন ঋতু বুঝেছিল, সেটা খুব সাধারণ।

একটা মিটিং চলছিল। সবাই কথা বলছে। সে একটা আইডিয়া ব্যাখ্যা করছিল—অর্ধেক বাক্যে থামল, শব্দ খুঁজছিল। তখন অদ্রি তার দিকে তাকায়নি, তবু বলল—

— “এই জায়গাটাই।”

ঋতু চমকে উঠেছিল।
কারণ সে ঠিক ওই জায়গাটাই বলতে চাইছিল।

এই মিলটা বিপজ্জনক।

এরপর থেকে ছোট ছোট মিল হতে লাগল।
একই সময়ে কফি নেওয়া।
একই ফাইলের নোটে একই মন্তব্য।

কেউ কিছু বলেনি।
কারণ বললে নাম দিতে হতো।

আর নাম দেওয়াটা তারা কেউই চাইছিল না।

আজও সন্ধ্যায় মেসেজ এল।

অদ্রি:

“আজ দেরি?”

এই প্রশ্নটা কাজের হতে পারে।
আবার নাও হতে পারে।

ঋতু লিখল—

“হ্যাঁ। কিন্তু কাজের জন্য না।”

এই উত্তরটা একটু বেশি সত্যি।

উত্তর এল—

অদ্রি:

“আমি বুঝেছি।”

এই বুঝেছি শব্দটাই তাকে কাঁপিয়ে দিল।

কারণ এখানে কোনো প্রশ্ন নেই।
কোনো অনুসন্ধান নেই।

শুধু গ্রহণ।

ঋতু জানে—এই গ্রহণটাই বিপজ্জনক।
কারণ এখানে কাউকে বোঝাতে হচ্ছে না।

সে চেয়ার ছেড়ে জানালার পাশে গেল। বাইরে গাড়ির শব্দ। শহর চলছে। ভেতরে সে থমকে আছে।

ফোন আবার কেঁপে উঠল।

অদ্রি:

“আজ কথা না হলেও চলবে।”

এই লাইনটা নিষিদ্ধ আকর্ষণের সবচেয়ে স্পষ্ট চিহ্ন।

কারণ এখানে না বলার সুযোগ আছে।

ঋতু লিখল না।
এইবার ইচ্ছে করেই।

কিছু টান উত্তর পেলে শক্ত হয়।
চুপ থাকলে নিয়ন্ত্রিত থাকে।

পরদিন অফিসে সব স্বাভাবিক।
মিটিং, ফাইল, সময়।

অদ্রি দূর থেকে মাথা নেড়েছে।
ঋতু ফিরিয়ে দিয়েছে।

এই ছোট্ট ইশারাগুলোই তাদের কথোপকথন।

লাঞ্চে তারা আলাদা বসেছে।
এই আলাদা বসাটাই নিরাপত্তা।

তবু ঋতু খেয়াল করল—অদ্রি তার দিকেই তাকাচ্ছে না, কিন্তু সে জানে—অদ্রি জানে সে কোথায় বসেছে।

এই জানা থাকাটাই নাম না থাকা টান।

সন্ধ্যায় ফের মেসেজ এল।

অদ্রি:

“আমাদের মাঝে যদি কিছু থাকে—”

ঋতুর বুকের ভেতরটা শক্ত হয়ে গেল।

তারপর পরের লাইন—

অদ্রি:

“—তাহলে সেটার নাম দরকার নেই।”

ঋতু চোখ বন্ধ করল।

এই কথাটার জন্যই সে ভয় পাচ্ছিল।
আবার এই কথাটাই সে চাইছিল।

১০

ঋতু লিখল—

“নাম দিলে দায়িত্ব আসে।”

উত্তর এল—

অদ্রি:

“আমি দায়িত্ব চাইনি।”

এই লাইনটা পরিষ্কার।
এখানে কোনো দাবি নেই।

১১

তারা আর এগোল না।
এই থামাটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

নাম না থাকলে টানটা সীমার ভেতরে থাকে।
সীমার ভেতরে থাকলেই নিষিদ্ধ হয়।

১২

রাত গভীর হলো।
আর কোনো মেসেজ এল না।

ঋতু বিছানায় শুয়ে ভাবল—
এই সম্পর্কটার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
কিন্তু কোনো অপরাধও নেই।

কারণ এখানে কেউ কাউকে ঠকাচ্ছে না।
কেউ সীমা ভাঙছে না।

১৩

পরদিন আবার একই রুটিন।
একই অফিস, একই সময়।

অদ্রি পাশ দিয়ে হেঁটে গেল।
হালকা করে বলল—

— “আজ ভালো দেখাচ্ছে।”

ঋতু থামল।
এই কথাটা খুব সাধারণ।
তবু খুব ব্যক্তিগত।

— “ধন্যবাদ,”
সে বলল।

এই দুটো শব্দেই সব শেষ।

১৪

ঋতু বুঝতে পারল—
এই টানটার কোনো নাম না থাকাই তার সৌন্দর্য।
নাম না থাকায় এটা দাবি করে না।
দখল করে না।

১৫

রাতে সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকল।
আজ ফোনটা আর দেখেনি।

কারণ কিছু টান কথা চায় না।
শুধু স্বীকৃতি চায়।

১৬

নাম না থাকা টান মানে—
যেটা বলা যায় না,
কিন্তু অস্বীকারও করা যায় না।

এই টান সীমা মানে।
এই টান থামতে জানে।

আর তাই—
এই টানই সবচেয়ে নিষিদ্ধ,
সবচেয়ে নিরাপদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *