রাত মানেই ঘুম—এই ধারণাটা অনেক আগেই ভেঙে গেছে।
রাত এখন ফিরে আসার সময়।
দিনভর ছড়িয়ে থাকা দু’জন মানুষ আবার এক ঘরে, এক ছাদের নিচে, নিজেদের কাছে ফেরে।
মেঘা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল।
বাইরে শহরের আলো—একটানা, নির্লিপ্ত। গাছের পাতায় বাতাস নড়ে উঠছে, আবার থেমে যাচ্ছে। সে জানে—এই থেমে যাওয়াগুলোই রাতে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।
ঘড়িতে রাত ন’টা কুড়ি।
আজও অর্ণব ফিরতে দেরি।
মেঘা অভ্যস্ত। তবু প্রতিদিনের মতো আজও একটা ছোট্ট অপেক্ষা থাকে—যেটা সে কাউকে বোঝাতে পারে না, নিজেকেও না।
১
তাদের বিয়ে হয়েছে এগারো বছর।
এগারো বছর মানে কেবল সময় না—মানুষ হওয়া। একসাথে বড় হওয়া। আলাদা আলাদা বদল, তবু একসাথে থাকা।
শুরুর দিকে অর্ণব ঠিক সময়ে ফিরত। মেঘা দরজার দিকে তাকিয়ে থাকত, রান্নাঘরের শব্দ বাড়ত। এখন সেই তাড়া নেই। কিন্তু তাড়া না থাকলেই কি অপেক্ষা থাকে না? থাকে। শুধু রূপ বদলায়।
মেঘা ঘরে ঢুকল। রান্নাঘরে গ্যাস নিভিয়ে দিল। খাবার তৈরি—ঢেকে রাখা। গরম করলে হবে। সে জানে, অর্ণব ফিরলে প্রথমেই খেতে চাইবে না। আগে বসবে, একটু চুপ করবে।
২
দরজার লক খুলবার শব্দ এলো।
মেঘা তাকাল না। সে জানে—এই না তাকানোটাই এখন তাদের স্বাভাবিক। এতে অগ্রাহ্য নেই, আছে বিশ্বাস।
— “ফিরলাম,”
অর্ণব বলল।
— “হাতমুখ ধুয়ে নাও,”
মেঘা বলল।
তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই। কেবল যত্ন।
অর্ণব ব্যাগ নামিয়ে রাখল। জুতো খুলল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দিনটা লম্বা ছিল—কথা, সিদ্ধান্ত, চাপ। এই দীর্ঘশ্বাসটা তার প্রথম বাড়ি-ফেরা।
৩
ডাইনিং টেবিলে তারা বসল। মেঘা খাবার গরম করল। অর্ণব নীরবে খেতে শুরু করল। এই নীরবতা ভারী না। বরং দরকারি।
— “আজ কেমন গেল?”
মেঘা জিজ্ঞেস করল।
— “ভিড়,”
অর্ণব বলল।
— “মাথার ভেতর।”
— “এখন?”
মেঘা জানতে চাইল।
অর্ণব একটু থামল।
— “এখন নামছে,”
সে বলল।
এই নামছে শব্দটাই মেঘার পছন্দ। মানে—দিনটা শেষ হচ্ছে।
৪
খাওয়ার সময় মেঘা লক্ষ্য করল—অর্ণব ধীরে খাচ্ছে। তাড়াহুড়ো নেই। সে জানে—এই ধীরতা মানে সে এখানে এসেছে। সত্যি করে।
খাওয়া শেষ হলে অর্ণব প্লেট তুলে নিল।
— “আমি ধুয়ে দিচ্ছি।”
মেঘা থামাল না। একসময় সে থামাত। এখন আর না। কারণ থামালে যত্ন কমে না, কিন্তু সুযোগ কমে।
৫
সোফায় বসে তারা দু’জনেই একটু চুপ করে থাকল। টিভি চালু নয়। ফোনও নয়। এই সিদ্ধান্তগুলো আলাদা করে নেওয়া হয় না—নিজেই তৈরি হয়েছে।
— “আজ বেলকনিতে দাঁড়িয়েছিলে?”
অর্ণব হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
মেঘা তাকাল।
— “কী করে জানলে?”
— “চুলে বাতাসের গন্ধ,”
অর্ণব বলল।
মেঘা হেসে ফেলল।
এই হাসিটা ছোট, কিন্তু সত্যি।
৬
রাতে ফিরে আসা মানে শুধু ঘরে ফেরা নয়।
মানে—একটা মন আরেকটার কাছে রাখা।
মেঘা চা বানাতে গেল। অর্ণব জানালার পাশে দাঁড়াল। বাইরে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরের গুঞ্জনটা ধীরে ধীরে কমছে।
— “চিনি কম?”
মেঘা জিজ্ঞেস করল।
— “হ্যাঁ,”
অর্ণব বলল।
এই ছোট ছোট প্রশ্ন—তাদের পরিচয়ের সবচেয়ে বড় চিহ্ন।
৭
চা নিয়ে তারা বসল। কাপের ভাপ উঠছে। অর্ণব কাপটা দুই হাতে ধরেছে। মেঘা লক্ষ্য করল—এটা তার ক্লান্তির ভঙ্গি।
— “আজ কথা কম রাখি?”
মেঘা বলল।
— “ভালো,”
অর্ণব বলল।
এই ভালো—একটা অনুমতি।
৮
তারা পাশাপাশি বসল। কাঁধ ছোঁয়নি। কিন্তু দূরত্বটাও বাড়তি নয়। এই মাঝামাঝি জায়গাটাই তাদের নিরাপদ।
— “মেঘা,”
অর্ণব ধীরে বলল।
— “হ্যাঁ?”
— “আমরা কি একে অপরকে মিস করি?”
এই প্রশ্নটা হঠাৎ।
কিন্তু অপ্রস্তুত নয়।
মেঘা ভেবে বলল—
— “দিনে হ্যাঁ।
রাতে আমরা ফিরে আসি।”
অর্ণব মাথা নেড়াল।
এই মাথা নেড়ানোটা স্বস্তির।
৯
বিছানায় যাওয়ার আগে তারা ঘর গুছিয়ে নিল। আলো কমাল। জানালার পর্দা টানল। এই কাজগুলো আলাদা করে ভাগ করা নেই—নিজেই ভাগ হয়ে গেছে।
বিছানার পাশে ল্যাম্প জ্বলছে। অর্ণব ফোনটা নামিয়ে রাখল।
— “আজ আর দেখব না,”
সে বলল।
মেঘা তাকাল।
— “ধন্যবাদ।”
এই ধন্যবাদটা ছোট।
কিন্তু গভীর।
১০
তারা পাশাপাশি শুয়ে। মাঝখানে সামান্য ফাঁক। এই ফাঁকটা তাদের ভয় দেখায় না। কারণ তারা জানে—এই ফাঁকই কখনো কখনো জায়গা দেয়।
— “তুমি কি ক্লান্ত?”
মেঘা জিজ্ঞেস করল।
— “হ্যাঁ,”
অর্ণব বলল।
— “কিন্তু আর একা না।”
এই একা না—মেঘার বুক হালকা করল।
১১
মেঘা ধীরে অর্ণবের দিকে ফিরল। খুব কাছে নয়—শুধু মুখোমুখি। অর্ণব তাকাল। চোখে কোনো তাড়া নেই। এই চোখে তাকানোর অভ্যাসটা তারা আবার শিখেছে—বছর পেরিয়ে।
— “কাছে আসব?”
অর্ণব ধীরে জিজ্ঞেস করল।
এই প্রশ্নটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ এখানে সম্মান আছে।
মেঘা মাথা নেড়াল।
— “এসো।”
অর্ণব খুব ধীরে কাছে এল। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। তার হাতটা মেঘার হাতের ওপর এল—নরম, স্থির। এই স্পর্শে কোনো দাবি নেই—শুধু উপস্থিতি।
১২
এই কাছাকাছিটা উত্তেজনার নয়।
এটা আশ্বাসের।
মেঘা চোখ বন্ধ করল। তার শ্বাস ধীরে হলো। অর্ণব থামল।
— “ঠিক আছে?”
সে জিজ্ঞেস করল।
— “হ্যাঁ,”
মেঘা বলল।
— “এইভাবেই।”
এই থামাটাই তাদের পরিণতি।
১৩
কিছুক্ষণ তারা চুপ করে রইল। শ্বাসের শব্দ। শহরের দূরের আওয়াজ। এই শব্দগুলো তাদের পরিচিত—বছরের পর বছর ধরে।
— “তুমি জানো,”
অর্ণব বলল,
— “রাতে আমি তোমার কাছে ফিরি।”
মেঘা হালকা হাসল।
— “আর আমি তোমাকে অপেক্ষায় পাই।”
এই কথাগুলো কোনো কবিতা নয়।
এগুলো সত্য।
১৪
রাতে ফিরে আসা মানে—
দিনভর জমে থাকা ভুল বোঝাবুঝি ধুয়ে যাওয়া।
মান-অভিমান মুছে যাওয়া।
মেঘা অনুভব করল—আজ তাদের মাঝে কোনো ভার নেই। শুধু থাকা।
১৫
ঘুম আসার আগে অর্ণব বলল—
— “কালও দেরি হতে পারে।”
মেঘা থামল।
— “জানি,”
সে বলল।
— “ফিরে এসো—এইটাই দরকার।”
অর্ণব তার হাতটা একটু শক্ত করে ধরল।
— “ফিরব।”
১৬
আলো নিভে গেল।
ঘর অন্ধকার।
কিন্তু অস্বস্তিকর নয়।
রাত মানে এখন ঘুম নয়।
রাত মানে—ফিরে আসা।
একজন আরেকজনের কাছে।
দিন শেষে।