নীরব যত্ন

নীরব যত্ন চোখে পড়ে না।
তবু নীরব যত্নই সংসারকে টিকিয়ে রাখে।

সুমনা বারান্দার দরজাটা বন্ধ করল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে—হালকা, একটানা। এই বৃষ্টিটা শহরের শব্দ ঢেকে দেয়, ঘরের ভেতরে একটা আলাদা শান্তি তৈরি করে। সে আলোটা একটু কমাল। আজ বেশি আলো দরকার নেই।

ঘড়িতে রাত আটটা পঁয়তাল্লিশ।
আজ রাহুল সময়মতো ফিরেছে।

এই সময়মতো কথাটার মানে বদলে গেছে বহু বছর আগে। এখন মানে—রাত খুব বেশি গাঢ় হওয়ার আগে।

তাদের বিয়ে হয়েছে বারো বছর।
বারো বছর মানে শুধু একসাথে থাকা না—একসাথে চুপ থাকতে শেখা।

শুরুর দিকে সুমনা সব কিছু মুখে বলত।
রাহুলও।

এখন তারা জানে—সব কথা বলা দরকার হয় না। কিছু কথা বোঝা যায়।

রাহুল সোফায় বসে জুতো খুলছিল। তার কাঁধ একটু ঝুঁকে আছে। সুমনা দূর থেকেই সেটা খেয়াল করল। সে জিজ্ঞেস করল না—আজ খুব ক্লান্ত?
কারণ প্রশ্ন করলে ক্লান্তি বেড়ে যায়।

সে রান্নাঘরে গেল।
চুলায় ডাল বসাল। ভাত গরম করল।
এই কাজগুলো তার কাছে অভ্যাস—কিন্তু অভ্যাস মানেই যান্ত্রিক না।

এগুলো নীরব যত্ন।

— “খেতে বসবে?”
সুমনা বলল।

— “একটু পরে,”
রাহুল বলল।
— “হাতমুখ ধুয়ে নিই।”

এই একটু পরে কথাটা সুমনার পরিচিত। সে জানে—এই সময়টায় রাহুল নিজের ভেতর থেকে দিনের ভার নামায়।

ডাইনিং টেবিলে তারা বসল। সুমনা প্লেট এগিয়ে দিল। রাহুল ধীরে খেতে শুরু করল। এই ধীরতা তাকে ভালো লাগে—মানে সে তাড়াহুড়ো করছে না।

— “বৃষ্টি হচ্ছে,”
রাহুল বলল।

— “হ্যাঁ,”
সুমনা উত্তর দিল।
— “ভালো লাগছে।”

— “হুম,”
রাহুল বলল।
এই হুম শব্দটা কোনো উদাসীনতা না। এটা সম্মতি।

খাওয়ার সময় তারা খুব বেশি কথা বলল না।
এই চুপচাপটা তাদের কাছে নতুন না।

সুমনা খেয়াল করল—রাহুল প্লেট শেষ করে থামল। আগের মতো দ্রুত উঠে গেল না। সে বসে রইল।

— “আর নেবে?”
সুমনা জিজ্ঞেস করল।

— “না,”
রাহুল বলল।
— “এইটুকু ঠিক।”

এই ঠিক শব্দটা তাদের সংসারের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ।

খাওয়া শেষে রাহুল প্লেট তুলে নিল।
— “আমি ধুয়ে দিচ্ছি।”

সুমনা বাধা দিল না। আগে দিত। এখন দেয় না। কারণ যত্ন ভাগ করলে কমে না—বাড়ে।

সে সোফায় এসে বসল। জানালার দিকে তাকাল। বৃষ্টির শব্দ। শহরের আলো ভিজে যাচ্ছে।

রাহুল এসে তার পাশে বসল। খুব কাছেও না, খুব দূরেও না। এই দূরত্বটা তাদের নিজেদের তৈরি—ঝগড়ার ফল না, অভিজ্ঞতার।

— “আজ দিনটা কেমন গেল?”
সুমনা জিজ্ঞেস করল।

— “শান্ত না,”
রাহুল বলল।
— “কিন্তু সহনীয়।”

— “এখন?”
সুমনা জানতে চাইল।

রাহুল একটু ভেবে বলল—
— “এখন শান্ত হচ্ছে।”

এই উত্তরটাই সুমনার দরকার ছিল।

নীরব যত্ন মানে—ঠিক সময়ে প্রশ্ন করা।
আর ঠিক সময়ে থেমে যাওয়া।

সুমনা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। সে জানে—আজ তার কাজ শুধু পাশে থাকা।

বৃষ্টি একটু জোরে পড়ছে। রাহুল উঠে জানালার কাছে গেল। বাইরে তাকাল। সুমনা দেখল—তার ভঙ্গিতে ক্লান্তি আছে, কিন্তু বিরক্তি নেই।

— “চা?”
সুমনা জিজ্ঞেস করল।

— “হালকা,”
রাহুল বলল।

এই হালকা শব্দটা তাদের কাছে মানে—কম চিনি, কম কথা, কম চাপ।

১০

চা বানানোর সময় সুমনা ভাবল—কবে থেকে সে এসব খেয়াল করতে শুরু করেছে? আগে সে শুধু ভালোবাসত। এখন সে বোঝে।

ভালোবাসা বদলায়।
রূপ বদলায়।
কিন্তু শেষ হয় না।

১১

চা নিয়ে এসে সে কাপটা এগিয়ে দিল। রাহুল কাপটা দুই হাতে ধরল। এই ভঙ্গিটা সুমনার চেনা—এই ভঙ্গি মানে আজ আর কিছু চাইবে না।

— “ধন্যবাদ,”
রাহুল বলল।

— “কিসের?”
সুমনা জানতে চাইল।

— “চুপ করে থাকার জন্য,”
রাহুল বলল।

সুমনা হেসে ফেলল।
— “এটা আমার বিশেষত্ব।”

১২

তারা পাশাপাশি বসে চা খেতে লাগল। কোনো গান নেই, টিভি নেই। শুধু বৃষ্টির শব্দ।

— “আমরা কি আগের মতো নেই?”
রাহুল হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

এই প্রশ্নটা মাঝে মাঝে আসে।
এটা অভিযোগ না—অনুসন্ধান।

সুমনা ভেবে বলল—
— “না।
আমরা আগের মতো নেই।”

রাহুল তাকাল।
— “খারাপ?”

— “না,”
সুমনা বলল।
— “আমরা এখন সত্যি।”

এই সত্যি শব্দটা রাহুলের মুখে একটা নরম ভাব এনে দিল।

১৩

সত্যি মানে—সবসময় খুশি না।
সত্যি মানে—সবসময় রোমাঞ্চ না।
সত্যি মানে—থাকা।

১৪

রাত বাড়ল। তারা ঘরে গেল। লাইট কম। বিছানার পাশে ল্যাম্প জ্বলছে। রাহুল ফোনটা চার্জে লাগাল, কিন্তু স্ক্রিনে তাকাল না।

— “আজ ফোন ছাড়াই থাকি,”
সে বলল।

সুমনা তাকাল।
— “ভালো।”

এই ভালো শব্দটা দু’জনেরই শান্তি।

১৫

তারা পাশাপাশি শুয়ে। মাঝখানে সামান্য ফাঁক। এই ফাঁকটা তাদের অস্বস্তিকর নয়। কারণ তারা জানে—এই ফাঁকই কখনো কখনো নিশ্বাস নেওয়ার জায়গা।

— “তোমার মাথাটা ব্যথা করছে?”
সুমনা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

রাহুল চমকে উঠল।
— “হ্যাঁ,”
সে বলল।
— “কী করে বুঝলে?”

— “আজ তুমি চোখ কম খুলছ,”
সুমনা বলল।

এই খেয়াল করাটাই নীরব যত্ন।

১৬

সুমনা ধীরে উঠে বসে রাহুলের পাশে এল। খুব কাছে নয়—কিন্তু যথেষ্ট। তার হাতটা রাহুলের কপালে রাখল। চাপ নয়, শুধু উপস্থিতি।

— “ঠিক আছে?”
সে জিজ্ঞেস করল।

রাহুল চোখ বন্ধ করল।
— “হ্যাঁ।”

এই হ্যাঁ শব্দটা ভরসার।

১৭

এই স্পর্শে কোনো তাড়া নেই।
কোনো দাবি নেই।

এই স্পর্শ বলে—
আমি আছি।

১৮

কিছুক্ষণ পর সুমনা থামল।
— “আরাম লাগছে?”
সে জানতে চাইল।

— “হ্যাঁ,”
রাহুল বলল।
— “এইটুকুই যথেষ্ট।”

এই যথেষ্ট শব্দটা তাদের জীবনের সারাংশ।

১৯

তারা আবার শুয়ে পড়ল। পাশাপাশি। সুমনা অনুভব করল—রাহুলের শ্বাস ধীরে হয়েছে। দিনের ভার নামছে।

— “সুমনা,”
রাহুল বলল।

— “হ্যাঁ?”

— “তুমি জানো,”
রাহুল ধীরে বলল,
— “আমি অনেক সময় তোমাকে কিছু বলি না।”

— “জানি,”
সুমনা বলল।
— “আর আমি অনেক সময় না বলেই বুঝে নিই।”

এই বোঝাপড়াটাই দাম্পত্যের আসল সাফল্য।

২০

ঘুম আসার আগে রাহুল বলল—
— “তুমি না থাকলে আমি আজকের দিনটা সামলাতে পারতাম না।”

সুমনা হালকা হাসল।
— “তুমি থাক বলেই আমি নীরব থাকতে পারি।”

এই কথাগুলো বড় কিছু নয়।
কিন্তু সত্য।

২১

আলো নিভে গেল।
বৃষ্টি পড়ছে।

নীরব যত্ন শব্দ করে না।
কিন্তু সে জাগিয়ে রাখে—
একটা সংসার,
দু’জন মানুষ,
একটা ছাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *