কিছু মানুষ থাকে—যাদের মুখ আমরা রোজ দেখি, কিন্তু ঠিক করে দেখি না।
তারা আমাদের জীবনের ব্যাকগ্রাউন্ডের মতো—থাকে, কিন্তু আলাদা করে চোখে পড়ে না।
যতদিন না কোনো একদিন, সেই পরিচিত মুখটাই সামনে এসে দাঁড়ায়—নতুন প্রশ্ন হয়ে।
১
সেঁজুতি সকালে জানালাটা খুলল। পাড়ার ভেতরের রাস্তাটা ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। দুধওয়ালার ঘণ্টি, স্কুলবাসের হর্ন, দোকানের শাটার ওঠার শব্দ—সব মিলিয়ে একেবারে চেনা সকাল। এই পাড়ায় সে প্রায় সারাজীবনই থেকেছে। বাড়িগুলো, গাছগুলো, মানুষগুলো—সব তার পরিচিত।
ঘড়িতে সকাল সাতটা পঞ্চাশ।
আজও সে অফিসে যাবে। আজও একই পথ। আজও একই চেনা মুখগুলো।
আর তাদের মধ্যেই একজন—অমিত।
২
অমিতকে সেঁজুতি চেনে অনেকদিন ধরে। পাড়ার ছেলেই বলা যায়। বয়সে তার চেয়ে বছর তিনেক বড়। ছোটবেলায় তাকে দূর থেকেই দেখত—সাইকেলে করে কোচিংয়ে যাওয়া, বিকেলে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা। বড় হওয়ার পর সেই দেখা বদলেছে—অফিসে যাওয়া-আসা, বাজার থেকে ব্যাগ হাতে ফেরা।
কথা খুব বেশি হয়নি কখনো।
কিন্তু দেখা—হয়েছে অগণিত।
এই দেখার ভেতরে কোনো কৌতূহল ছিল না।
অমিত ছিল—পাড়ার অংশ।
৩
আজ সকালে সেঁজুতি নিচে নামতেই অমিতকে দেখল। সে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। চুলে সামান্য পাক ধরেছে—আগে খেয়াল করেনি। শার্টের হাতা গুটানো। মুখে হালকা ক্লান্তি।
অমিত ফোন নামিয়ে তাকাল।
— “অফিস?”
এই এক শব্দ।
এই প্রথম সে নিজে থেকে কথা বলল।
— “হ্যাঁ,”
সেঁজুতি বলল।
— “আপনি?”
— “আমিও,”
অমিত বলল।
এই আমিও শব্দটা অদ্ভুতভাবে সমান করে দিল দু’জনকে।
৪
তারা পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। পাড়ার রাস্তাটা খুব চওড়া না। দু’জন পাশাপাশি চললে দূরত্ব রাখা যায়, আবার কাছেও থাকা যায়। আজ তারা মাঝামাঝি জায়গাটাই বেছে নিল।
— “অনেকদিন একসাথে বেরোনো হয়নি,”
অমিত বলল।
সেঁজুতি ভেবে বলল—
— “আসলে… কখনো দরকার পড়েনি।”
অমিত হালকা হাসল।
— “পরিচিত মানুষদের সঙ্গে দরকার না পড়লে কথা হয় না।”
এই কথাটা সেঁজুতির মনে রয়ে গেল।
৫
হাঁটার সময় সে খেয়াল করল—অমিত খুব স্বাভাবিকভাবে হাঁটে। কোনো তাড়া নেই। ফোন দেখছে না। সামনে তাকিয়ে কথা বলছে। এই ভঙ্গিটা আজ তার চোখে পড়ল—আগে পড়েনি।
— “আপনি কি এখনও এই পাড়াতেই থাকবেন?”
সেঁজুতি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
প্রশ্নটা অকারণ।
কিন্তু বেরিয়ে গেল।
— “হ্যাঁ,”
অমিত বলল।
— “এখানেই বড় হয়েছি। বদলানোর দরকার মনে হয়নি।”
এই দরকার মনে হয়নি কথাটার ভেতরে একটা স্থিরতা আছে।
৬
মোড়ে এসে তাদের পথ আলাদা হলো। সেঁজুতি থামল। অমিতও।
— “তাহলে… আবার দেখা হবে,”
অমিত বলল।
— “হ্যাঁ,”
সেঁজুতি বলল।
এই হ্যাঁ কোনো প্রতিশ্রুতি না।
কিন্তু ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত।
৭
দিনটা সেঁজুতির অদ্ভুতভাবে কাটল। কাজের ফাঁকে বারবার মনে পড়ছিল—সকালের হাঁটা, অমিতের কথা বলার ভঙ্গি, চোখের দিকে না তাকিয়েও মনোযোগ দেওয়া।
সে নিজেকে বোঝাতে চাইল—এগুলো কিছু না।
কিন্তু মন বোঝে না সব যুক্তি।
৮
ফেরার সময় আবার দেখা হলো। পাড়ার গলিতে ঢোকার মুখে অমিত দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে বাজারের ব্যাগ।
— “আজ দেরি?”
সে জিজ্ঞেস করল।
— “হ্যাঁ,”
সেঁজুতি বলল।
— “কাজ টেনে গেল।”
— “তাহলে একসাথে হাঁটি?”
অমিত বলল।
এই প্রশ্নটা খুব সাধারণ।
কিন্তু আজ নতুন।
— “চলুন,”
সেঁজুতি বলল।
৯
বাজারের ব্যাগটা ভারী মনে হলো না অমিতের। সে মাঝেমাঝে থামছে, রাস্তার কুকুরটাকে জায়গা দিচ্ছে, পরিচিত দোকানদারের দিকে মাথা নেড়ে সম্ভাষণ জানাচ্ছে। এই সবকিছু মিলিয়ে সে যেন পাড়াটার ভেতরেই মিশে আছে।
— “আপনি পাড়ার সবাইকে চেনেন,”
সেঁজুতি বলল।
— “পাড়া আমাকে চেনে,”
অমিত বলল।
— “ওটাই বড় কথা।”
এই কথাটার ভেতরে দায়িত্বের গন্ধ।
১০
সেঁজুতির মনে হলো—এই মানুষটাকে সে এতদিন দেখেছে, কিন্তু বুঝতে চায়নি। পরিচিত মুখ কখনো কখনো আড়াল হয়ে যায়।
— “আপনি কি কখনো ভেবেছেন—এখান থেকে চলে যাবেন?”
সে জিজ্ঞেস করল।
— “ভেবেছি,”
অমিত বলল।
— “কিন্তু যাওয়ার আগে বুঝেছি—থাকাটাও একটা সিদ্ধান্ত।”
এই থাকাটাও সিদ্ধান্ত কথাটা সেঁজুতিকে নীরব করে দিল।
১১
বাড়ির সামনে এসে তারা থামল। অমিত তার ব্যাগটা নামাল।
— “আপনি ভালো থাকুন,”
সে বলল।
— “আপনিও,”
সেঁজুতি বলল।
এই বিদায়টা খুব ছোট।
কিন্তু আজ আলাদা।
১২
রাতে সেঁজুতি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। পাড়ার আলো, চেনা শব্দ। আজ সবকিছু একই—শুধু তার দেখার চোখ বদলে গেছে।
সে ভাবল—পরিচিত মুখ মানেই কি চেনা মানুষ?
নাকি চেনা মানুষ হতে সময় লাগে?
১৩
পরদিন সকালে আবার দেখা। একই সময়, একই রাস্তা। আজ কথা শুরু করতে দেরি হলো না।
— “কাল আপনার বাজারটা ভারী লাগেনি?”
সেঁজুতি জিজ্ঞেস করল।
অমিত হেসে বলল—
— “অভ্যাস হয়ে গেছে।”
— “সবকিছুই কি অভ্যাসে টিকে থাকে?”
সেঁজুতি প্রশ্ন করল।
— “না,”
অমিত বলল।
— “কিছু জিনিস সচেতনভাবে ধরে রাখতে হয়।”
এই কথাটা সেঁজুতির ভেতরে কোথাও গিয়ে থামল।
১৪
তারা হাঁটল। কথা হলো। থামল। আবার হাঁটল। আজ কোনো তাড়াহুড়ো নেই। দু’জনেই যেন জানে—এই হাঁটাটাই আলাদা।
— “আপনি কি সকালে হাঁটতে বেরোন?”
অমিত জিজ্ঞেস করল।
— “না,”
সেঁজুতি বলল।
— “কেন?”
— “পাড়া তখন আলাদা লাগে,”
অমিত বলল।
— “কম শব্দ, বেশি মানুষ।”
এই বেশি মানুষ কথাটার মানে সেঁজুতি বুঝল।
১৫
সপ্তাহ কেটে গেল। তাদের হাঁটা নিয়ম হয়ে উঠল। কথা বাড়ল, কিন্তু তাড়াহুড়ো করল না। কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করল না—কেন এই নিয়ম। কারণ নিয়মটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
পাড়ার লোকজন দেখল—কেউ কিছু বলল না।
পরিচিত মুখের পাশে আরেক পরিচিত মুখ—এটাই তো স্বাভাবিক।
১৬
একদিন বৃষ্টি নামল। হালকা। তারা ছাতা ভাগ করে নিল। কাঁধ ছুঁল না। তবু কাছাকাছি।
— “আজ ছাতা না থাকলে ভিজে যেতাম,”
সেঁজুতি বলল।
— “কখনো ভিজতেও হয়,”
অমিত বলল।
— “সবসময় এড়ালে বোঝা যায় না—বৃষ্টি কেমন।”
এই কথাটা সে হালকা গলায় বলল।
কিন্তু অর্থটা গভীর।
১৭
সেঁজুতি বুঝল—এই মানুষটা তাকে কোনো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাচ্ছে না। সে নিজেই প্রশ্ন করছে। এই প্রশ্নগুলো ভয় দেখাচ্ছে না—ভাবাচ্ছে।
১৮
এক সন্ধ্যায় তারা হাঁটতে হাঁটতে থামল। পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে আলো দেখল।
— “আমরা কি খুব চুপচাপ?”
সেঁজুতি জিজ্ঞেস করল।
— “চুপ মানেই ফাঁকা না,”
অমিত বলল।
— “কখনো চুপে বেশি কথা থাকে।”
এই কথাটার পর তারা আর কিছু বলল না।
১৯
ঘরে ফিরে সেঁজুতি অনুভব করল—তার ভেতরে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কোনো উত্তেজনাও নেই। আছে শুধু এক ধরনের নিশ্চিন্ত টান—যেটা ধীরে তৈরি হচ্ছে।
২০
পরিচিত মুখের গল্প এমনই হয়।
হঠাৎ করে প্রেম হয়ে যায় না।
ধীরে ধীরে মানুষটা সামনে আসে।
আর তখন বোঝা যায়—
পরিচিত মুখ
আসলে
অচেনা অনুভূতির দরজা।