বৃষ্টি নামার আগের সময়টা আমার বরাবরই ভালো লাগে।
আকাশ তখনো পুরো ভেঙে পড়ে না, কিন্তু বাতাসে একটা অদ্ভুত ভার থাকে—যেন কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
অফিসের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আমি সেই বাতাসটাই অনুভব করছিলাম।
হঠাৎ পেছন থেকে গলার স্বর এল—
— “আজ দেরি করবে?”
আমি ঘুরে তাকালাম।
আরিয়ান।
সে খুব কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। এতটাই কাছে যে আমি তার উপস্থিতিটা আলাদা করে টের পেলাম। গায়ে কোনো সুগন্ধ নেই, তবু তার নিজের একটা গন্ধ আছে—পরিচ্ছন্ন, শান্ত।
— “হ্যাঁ,” আমি বললাম,
— “বৃষ্টি নামলে বেরোতে ইচ্ছে করে না।”
সে জানালার দিকে তাকাল।
— “তোমারও না?”
আমি কিছু বললাম না।
কিছু প্রশ্নের উত্তর নীরবতাই দেয়।
আমরা একই টিমে কাজ করি।
ছয় মাস।
এই ছয় মাসে আমাদের মধ্যে খুব বেশি কথা হয়নি—কিন্তু খুব কমও না।
কিছু সম্পর্ক কথা দিয়ে তৈরি হয় না।
চুপচাপ তৈরি হয়।
বাইরে প্রথম ফোঁটা পড়ল।
কাঁচে ছোট একটা দাগ।
আরিয়ান হাত বাড়িয়ে জানালার পাল্লাটা একটু বন্ধ করল। সেই মুহূর্তে তার হাতটা আমার হাতের খুব কাছ দিয়ে গেল। স্পর্শ হলো না—কিন্তু দূরত্বটুকু অনুভব করার জন্য যথেষ্ট ছিল।
আমি নিশ্বাসটা একটু গভীর করে নিলাম।
সে খেয়াল করল কি না জানি না।
— “চা খাবে?” সে জিজ্ঞেস করল।
আমি মাথা নেড়ালাম।
প্যান্ট্রিতে আমরা পাশাপাশি দাঁড়ালাম। খুব সাধারণ দৃশ্য। তবু কোথাও যেন একটা অস্বাভাবিক সচেতনতা।
চায়ের কাপটা নিতে গিয়ে আমার আঙুল তার আঙুল ছুঁয়ে গেল।
এইবার সত্যিই।
খুব সামান্য।
এক সেকেন্ডেরও কম।
কিন্তু আমি হাত সরালাম না।
সেও না।
কেউ কিছু বলল না।
তারপর সে নিজেই এক কদম পেছাল।
যেন বুঝিয়ে দিল—এই পর্যন্তই।
এই সংযমটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিল।
আমরা চা হাতে জানালার পাশে এসে দাঁড়ালাম। বাইরে এখন জোরে বৃষ্টি। ভেতরে শুধু দুটো কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে।
— “তুমি খুব কম কথা বলো,” সে বলল।
আমি তাকালাম।
— “কিছু কথা শব্দ চায় না।”
সে হাসল।
এই হাসিটা নতুন।
হালকা, কিন্তু গভীর।
— “তোমার পাশে দাঁড়ালে,” সে ধীরে বলল,
— “শব্দের দরকার পড়ে না—এটা ঠিক।”
এই কথাটা কোনো প্রস্তাব না।
কোনো দাবি না।
শুধু স্বীকারোক্তি।
আমি জানালার বাইরে তাকালাম।
বৃষ্টি এখন পুরো নামছে।
আমাদের মাঝে কোনো স্পর্শ নেই।
কিন্তু উপস্থিতি আছে।
আর কিছু অনুভূতি স্পর্শ ছাড়াও তীব্র হতে পারে—এই সত্যিটা আমি এই প্রথম বুঝলাম।
⏭️ পর্ব ২-এ কী আসছে?
Episode 2: “একই টেবিল”
- অফিসের বাইরে প্রথম একসাথে সময়
- আরও কাছাকাছি বসা
- সীমারেখা আরও স্পষ্ট