অফিসের বাইরে প্রথমবার একসাথে বসাটা পরিকল্পনা করা ছিল না।
বৃষ্টি থামার পর সন্ধ্যাটা হঠাৎ নরম হয়ে এসেছিল। জানালার কাঁচে জমে থাকা পানির দাগগুলো মিলিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক আমার মাথার ভেতরের অস্থিরতার মতো।
আরিয়ান বলেছিল,
— “নীচের ক্যাফেটায় বসি?”
আমি মাথা নেড়েছিলাম।
হ্যাঁ বা না—এই দুটো শব্দের মাঝখানে আজ আমি ছিলাম।
ক্যাফেটা খুব সাধারণ। কাঠের টেবিল, নরম আলো। বাইরে রাস্তার শব্দ ঢুকছে, কিন্তু ভেতরে একটা আলাদা ছন্দ। আমরা জানালার পাশের টেবিলটায় বসলাম। একই টেবিল, কিন্তু বিপরীত দিকে না—পাশাপাশি।
এই বসাটাই সবকিছু বদলে দিল।
আমাদের কাঁধের মাঝে খুব সামান্য ফাঁক। এতটাই কম যে নড়াচড়া করলে স্পর্শ হয়ে যেতে পারে। আমি নিজেকে স্থির রাখার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু সচেতনতা নিজে থেকেই শরীরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ছিল।
কফি এলো। ধোঁয়া উঠছে।
— “তুমি কী ভাবছিলে?” আরিয়ান হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
আমি একটু থামলাম।
— “এই যে,” জানালার বাইরে ইশারা করলাম,
— “মানুষ কীভাবে একা একা হাঁটছে—তবু সবাই কারও না কারও গল্পের অংশ।”
সে আমার দিকে তাকাল।
খুব মন দিয়ে।
— “তুমি এমন কথা বলো,” সে বলল,
— “যেন শব্দগুলো বেছে বেছে আসে।”
আমি হাসলাম।
— “শব্দগুলো আসে না,” বললাম,
— “থেকে যায়।”
এই কথার পর আমাদের মাঝে একটা নীরবতা নামল।
এই নীরবতাটা অস্বস্তিকর না। বরং নিরাপদ।
আমি খেয়াল করলাম, সে কফির কাপটা ধরেছে দুই হাতে। আঙুলগুলো স্থির। কিন্তু কণ্ঠে একটা উষ্ণতা।
— “তুমি খুব সংযত,” সে বলল।
— “কিন্তু তোমার চোখে সবকিছু দেখা যায়।”
এই কথাটা শুনে আমি চোখ সরালাম না।
বরং প্রথমবারের মতো ওর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
কিছুক্ষণ আমরা কথা বললাম কাজ নিয়ে। খুব স্বাভাবিক। তবু কথার ফাঁকে ফাঁকে অন্য কিছু ভেসে উঠছিল—যেটা আমরা নাম দিচ্ছিলাম না।
কফি শেষ হয়ে এলো।
আমি চেয়ারটা সামান্য সরালাম। সেই মুহূর্তে আমাদের কাঁধে কাঁধ লেগে গেল। খুব হালকা। প্রায় ভুল করে যাওয়ার মতো।
কিন্তু আমি ভুলে যেতে পারলাম না।
আরিয়ানও নড়েনি।
এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।
তারপর সে নিজেই একটু দূরে সরে গেল।
এই দূরে সরে যাওয়াটা আমাকে অবাক করল।
কারণ এতে কোনো ভয় ছিল না—ছিল সম্মান।
— “চল?” সে বলল।
বাইরে বেরিয়ে দেখি, রাস্তা ভেজা। বাতাসে মাটির গন্ধ। আমরা পাশাপাশি হাঁটছি। কোনো তাড়া নেই।
— “তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?” সে বলল।
— “করো।”
— “তুমি কি সবসময় এতটা নিজেকে সামলে রাখো?”
আমি হাঁটা থামালাম।
তার দিকে তাকালাম।
— “সবসময় না,” বললাম।
— “শুধু যখন দরকার।”
সে হালকা হাসল।
— “আজ দরকার ছিল?”
আমি আকাশের দিকে তাকালাম।
— “আজ… সীমারেখাটা জানা দরকার ছিল।”
সে কিছু বলল না।
শুধু মাথা নেড়াল।
আমরা আলাদা হলাম মোড়ের কাছে।
বিদায়ের সময় কোনো হাত নড়ল না।
কোনো প্রতিশ্রুতি না।
কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে আমি বুঝতে পারছিলাম—
এই একই টেবিলে বসাটা একটা শুরু।
নীরব।
সংযত।
কিন্তু স্পষ্ট।
⏭️ পর্ব ৩-এ কী আসছে?
Episode 3: “ধীর শ্বাস”
- কাছাকাছি কাজ করা
- শ্বাসের উপস্থিতি
- Male POV-তে ভেতরের টানাপোড়েন