নীরব স্পর্শ – পর্ব ৩ – ধীর শ্বাস

আমি সাধারণত নিজের শ্বাস টের পাই না।
শ্বাস আসে–যায়, কাজ চলে, দিন এগোয়। কিন্তু অনন্যার পাশে থাকলে শ্বাসটা আলাদা হয়ে যায়—ধীরে, সচেতনভাবে।

অফিসে আজ কাজের চাপ ছিল। মিটিং, মেইল, সময়সীমা। তবু মনটা বারবার জানালার দিকে যাচ্ছিল। জানালার বাইরে কিছু নেই—শুধু আলো। তবু আমার চোখ খুঁজছিল ওকে।

সে ডেস্কে বসে কাজ করছিল। চুলগুলো কানের পেছনে গোঁজা। কাঁধের ভঙ্গিটা স্থির, কিন্তু মনোযোগে একটা নরম ভাব। খুব কাছেই ছিল, অথচ নিজের ভেতরে একটা সীমারেখা টেনে রেখেছে—আমি সেটা বুঝতে পারি।

আমি উঠে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
— “ফাইলটা দেখেছ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

সে মাথা তুলে তাকাল।
এই তাকানোটা আমাকে প্রতিবার থামিয়ে দেয়।
— “হ্যাঁ,” সে বলল,
— “শেষটা একটু বদলানো দরকার।”

আমরা একই স্ক্রিনের দিকে তাকালাম। খুব কাছাকাছি। এতটাই যে আমি ওর শ্বাসের গতি বুঝতে পারছিলাম। সে হয়তো বুঝছিল আমারটা।

আমি নিজেকে এক কদম পেছাতে চাইলাম। পারলাম না।
কারণ এই কাছাকাছিটা কোনো অস্বস্তি তৈরি করছিল না। বরং সতর্কতা।

আমি বললাম,
— “এভাবে ঠিক আছে।”

সে মাথা নেড়াল।
তারপর ধীরে চেয়ারটা একটু ঘোরাল। দূরত্বটা ফিরিয়ে দিল।
এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলোই আমাকে ভাবায়।

দুপুরের দিকে আমরা একসাথে কফি আনতে গেলাম। লিফটে নামার সময় জায়গা কম। দরজা বন্ধ হলো। চারদিকে আয়না।

আমি আয়নায় নিজের মুখ দেখলাম—স্বাভাবিক।
তারপর ওকে। শান্ত।

লিফট নামছিল। সময়টা যেন একটু দীর্ঘ।

— “আজ বৃষ্টি হবে,” সে বলল।

— “হতে পারে,” আমি বললাম।
— “তুমি বৃষ্টি পছন্দ করো?”

সে একটু ভেবে বলল,
— “যখন তাড়া থাকে না।”

এই কথাটা আমার ভেতরে কোথাও আটকে গেল।
আমি বুঝলাম, ও তাড়া পছন্দ করে না—মানুষের কাছেও না।

কফি হাতে ফেরার পথে আমাদের হাত কাছাকাছি এলো। স্পর্শ হলো না। কিন্তু দূরত্বটুকু ছিল খুব কম। আমি ইচ্ছা করে হাত সরালাম না। সেও না।

এই সংযত স্থিরতাই আমাকে শিখিয়েছে—সব অনুভূতির প্রকাশ দরকার হয় না।

বিকেলে কাজ শেষে সে বলল,
— “আজ আমি একটু হাঁটব।”

আমি বললাম,
— “আমি সঙ্গ দেব?”

সে থামল।
এক সেকেন্ড।
তারপর বলল,
— “দাও।”

আমরা পাশাপাশি হাঁটছিলাম। শহরের শব্দ, ভেজা বাতাস। কথা কম। তবু উপস্থিতি অনেক।

আমি বললাম,
— “তুমি খুব স্পষ্ট।”

সে হেসে ফেলল।
— “স্পষ্ট মানে?”

— “যেখানে থামতে হবে, জানো,” আমি বললাম।

সে তাকাল।
— “আর তুমি?”

আমি একটু দেরি করে বললাম,
— “আমি শিখছি।”

এই সত্যিটা বলা দরকার ছিল।

হাঁটতে হাঁটতে আমাদের শ্বাস এক ছন্দে এলো। আমি টের পেলাম। এই ছন্দটা অদ্ভুতভাবে শান্ত। কোনো উত্তেজনা নেই—আছে গভীরতা।

মোড়ের কাছে এসে আমরা থামলাম।
— “এখান থেকে আমি,” সে বলল।

আমি মাথা নেড়ালাম।
— “ঠিক আছে।”

কোনো হাত নড়ল না।
কোনো কথা বাড়ল না।

সে চলে গেল।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম একটু।

আমি বুঝলাম—কিছু সম্পর্ক ধীরে শ্বাস নেয়।
আর সেই ধীর শ্বাসই সবচেয়ে স্থায়ী।


⏭️ পর্ব ৪-এ কী আসছে?

Episode 4: “সীমারেখা”

  • কাজের বাইরে এক সন্ধ্যা
  • সীমা টানা ও মানা
  • Dual POV

One thought on “নীরব স্পর্শ – পর্ব ৩ – ধীর শ্বাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *